
কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি: দীর্ঘ ৩৫ বছর ৯ মাস ৫ দিনের শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তি। অসংখ্য শিক্ষার্থীর হাতে অক্ষরজ্ঞান তুলে দেওয়া, নৈতিক শিক্ষা প্রদান এবং আলোকিত মানুষ গড়ার নিরলস প্রচেষ্টার পর অবসরজনিত বিদায় নিলেন ডহরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জনাব আনন্দ কুমার মল্লিক। দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ, সহকর্মীদের ভালোবাসা এবং আবেগঘন পরিবেশে যশোরের কেশবপুর উপজেলার সুফলাকাটী ইউনিয়নের ডহরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে তাঁর অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল ১০টায় ডহরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে শিক্ষা কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকা, সাবেক শিক্ষক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ, শুভকামনা ও ভালোবাসায় অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে আবেগঘন ও স্মরণীয়। দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকেই তাঁর কর্মজীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন এবং অবসরজীবনের সুখ, শান্তি ও সুস্বাস্থ্য কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডহরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও সাবেক শিক্ষক মকবুল হোসেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেশবপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (চলতি দায়িত্ব) মোঃ নজরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস.এম. মুরাদ হোসেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন লিমা সরকার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানুষ গড়ার মহান দায়িত্ব। একজন শিক্ষক তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আনন্দ কুমার মল্লিক দীর্ঘ ৩৫ বছর ৯ মাস ৫ দিনের কর্মজীবনে শিক্ষাক্ষেত্রে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তা সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তাঁর অবসরজীবন সুস্থতা, শান্তি ও আনন্দে কাটুক—এই কামনা করি।”
সভাপতির বক্তব্যে সাবেক শিক্ষক মকবুল হোসেন বলেন, “একজন শিক্ষক অবসরে গেলেও তাঁর কর্ম, আদর্শ ও স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না। আনন্দ কুমার মল্লিকের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের কর্মসম্পর্ক ও অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। তাঁর বিদায় আমাদের জন্য আবেগের মুহূর্ত। তাঁর অবসরজীবন সুন্দর ও স্বস্তিময় হোক—এই প্রত্যাশা করি।”
স্বাগত বক্তব্যে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস.এম. মুরাদ হোসেন বলেন, “একজন অভিজ্ঞ সহকর্মীকে বিদায় জানানো আমাদের জন্য আনন্দের পাশাপাশি বেদনারও। আনন্দ কুমার মল্লিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ ও স্মৃতি আমাদের বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে। তাঁর অবদান আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুলাল চন্দ্র সরকার, মোঃ জহির উদ্দিন, পলাশ কান্তি হালদার, নম্র কুমার মণ্ডল, মোঃ হারুন উর রশিদ এবং মোছাঃ তানিয়া আক্তার। তাঁরা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, একজন শিক্ষকের প্রকৃত সার্থকতা তাঁর কর্মজীবনের দৈর্ঘ্যে নয়, বরং তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থী এবং সমাজে রেখে যাওয়া ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যে নিহিত। আনন্দ কুমার মল্লিকের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন নতুন প্রজন্মের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তাঁরা তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সুন্দর অবসরজীবন কামনা করেন।
সাবেক প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলামের স্মৃতিচারণ: বেতীখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করা। দীর্ঘ কর্মজীবনে একজন শিক্ষক অসংখ্য মানুষের জীবনে নিজের ছাপ রেখে যান। আনন্দ কুমার মল্লিকের বিদায়বেলায় তাঁর কর্মজীবনের স্মৃতিগুলো আমাদের মনে থাকবে। তাঁর অবসরজীবন সুখ, শান্তি ও সুস্বাস্থ্যে ভরে উঠুক।”
নারায়ণপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেলাল হাসান শহীদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষা হলো একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গঠনের প্রথম ধাপ। এ পর্যায়ে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আনন্দ কুমার মল্লিকের মতো অভিজ্ঞ শিক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার ভিত শক্ত করতে কাজ করেছেন। তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও অবদান শিক্ষাঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর অবসরজীবন সুন্দর ও আনন্দময় হোক—এই কামনা করি।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন শিক্ষক আমানুল্লাহ আমান, দীন মোহাম্মদ ইসলাম, জহুরুল ইসলাম, আব্দুস সাত্তার, রফিকুল ইসলাম, আবু হাসান ও হুমায়ুন কবির। তাঁরা আনন্দ কুমার মল্লিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বক্তারা বলেন, একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক কর্মজীবন শেষে অবসরে গেলেও তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও স্মৃতি শিক্ষার্থীদের জীবনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। আনন্দ কুমার মল্লিকের কর্মজীবন ও সহকর্মীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সুসম্পর্ক ভবিষ্যতেও সবার মনে জায়গা করে থাকবে।
এ সময় কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বেতীখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম, আমানুল্লাহ আমান, দীন মোহাম্মদ ইসলাম, জহুরুল ইসলাম, আব্দুস সাত্তার, রফিকুল ইসলাম, আবু হাসান ও হুমায়ুন কবির। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আগত শিক্ষক-শিক্ষিকারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সহকর্মীরা আনন্দ কুমার মল্লিকের সঙ্গে কাটানো দীর্ঘদিনের কর্মজীবনের স্মৃতি তুলে ধরেন। তাঁরা তাঁর নিষ্ঠা, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষকতার প্রতি দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করে অবসরজীবনে সুস্থতা ও পারিবারিক সুখ-শান্তি কামনা করেন। অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের কর্মজীবনের প্রতি সম্মান জানানো হয় এবং তাঁর অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
ডহরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ বিদায় সংবর্ধনা শেষ হয় আনন্দ কুমার মল্লিকের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শুভকামনা জানানোর মধ্য দিয়ে। কর্মজীবনের ব্যস্ত দিনগুলো পেছনে ফেলে তিনি অবসরজীবনে প্রবেশ করলেও তাঁর অর্জিত অভিজ্ঞতা, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক বিদ্যালয় পরিবারের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে—এমন প্রত্যাশা উপস্থিত সবার।