
“অসুস্থতা ও দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে,বেঁচে আছে অন্ধ বোন রুপালী ও অসুস্থ ভাই তোকাব্বর”
নিজস্ব প্রতিবেদক:
একসময় রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন তুকাব্বর শেখ। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে কাটতো তার জীবন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতায় বর্তমানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন রিকশাচালক তুকাব্বর। সারা শরীরে ঘা আর ডান পায়ে গ্যাঙরিনে আক্রান্ত দরিদ্র তুকাব্বরকে ছেড়ে গেছেন স্ত্রী, খোঁজ নেয় না সন্তানরাও। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বোন রুপালি খাতুনই এখন তার একমাত্র ভরসা।
যশোর পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের পাগলদহ বিহারি কলোনির বাসিন্দা তুকাব্বর শেখ। দীর্ঘ ১৫ বছর যাবত বিনা চিকিৎসায় ছটফট করছেন তিনি। ছোট্ট একটি চৌকির ওপর অসাড় হয়ে পড়ে থাকেন। শরীরের ঘা থেকে বের হওয়া উৎকট গন্ধ সেই গন্ধের কারণে আশেপাশের কেউ তার কাছে ভিড়তে চায় না। এমনকি তার এই রোগের কারণে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না কোন চিকিৎসা কেন্দ্রে।
এই পরিবারটি দীর্ঘদিন যাবত অসহায় ও মানবতার জীবনযাপন করছিল। এমন সময় তার পাশে দাঁড়ালেন একটি সামাজিক সংঘ্য “আমরা সবাই এক”
“আমরা সবাই এক সামাজিক সংঘ্যের” সভাপতি মো: মিলন শেখ, জানান এই সংঘ্যের পক্ষ থেকে আমরা যে উপহার সামগ্রী তুকাব্বর ও তার অন্ধ্য বোনকে দিয়েছি যা কিছু দিন অনাহারের জীবন দশা থেকে পরিত্রাণ পাবে। ও বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও বাজার সামগ্রী এরমধ্যে রয়েছে, অন্তত দুবেলা দু’মুঠো খেয়ে শারীরিক শক্তি ফিরে পাবে এই অসহায় দরিদ্র পরিবারটি।
উপহার সামগ্রী বিতরণে উপস্থিত ছিলেন”আমরা সবাই এক সামাজিক সংঘের সভাপতি মো: মিলন শেখ, আরো উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের অন্যতম সদস্য শাওন রহমান, আজমীর হোসেন, রনজিত কুমার, ইমন শেখ, সুজন গাজী, মোজাম্মেল হোসেন প্রান্ত, নূর আলী শেখ, প্রমুখ।
মিলন শেখ জানান দীর্ঘদিন অনাহারে ও দরিদ্রতার মাঝে দিন কাটাচ্ছিলেন রূপালী ও তার ভাই তুকাব্বর। “আমরা সবাই এক” সামাজিক সংঘের পক্ষ থেকে উপহার সামগ্রী পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন রূপালী। রুপালী জানান অন্তত দুবেলা দু’মুঠো খেয়ে কিছুদিন আমার ভাই সুস্থ থাকবে। তবে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিত্বরা যদি আমাদের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে আমার ভাই আবারো সুস্থ হয়ে উঠবে এটাই প্রত্যাশা করে বোন রুপালি।
অন্ধ বোন রুপালি বলেন, ‘আমার ভাই একসময় নিজেই উপার্জন করতো। কিন্তু সারাশরীরে ঘা হওয়ার পর থেকে আর রিকশা চালাতে পারে না। ডান পায়ে গ্যাঙরিন হয়ে পচন ধরেছে। চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। লোকের কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে যা পাই, তা দিয়ে তিনবেলার খাবারই জোটে না।’কিভাবে তাকে চিকিৎসা করাবো।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রুপালি খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, ভাইয়ের জন্য সাহায্য চাইতে গেলে অনেকেই বলে, ‘ও আর বাঁচবে কয়দিন! তার থেকে ভালো মাটি চাপা দিয়ে দ্যাও। কথাগুলো বলতে গিয়ে রুপালির চোখ ভিজে আসে। ভাঙাকণ্ঠে রুপালি বলেন, ‘মা এই অসুস্থ ভাইকে আমার জিম্মায় রেখে গেছে। আমি কী করে তারে ফেলায় দেবো!’
একমাস আগেও হেঁটে-চলে বেড়াতেন তুকাব্বর। কিন্তু অটোরিকশা চাপায় পা ভেঙে যাওয়ার পর আরও অসহায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা লাকি বেগম বলেন, ‘পরিবারটিকে দেখার মতো কেউ নেই। অন্ধ বোন তার দেখাশোনা করে। সে নিজেও চলতে পারে না।’ সমাজের বিত্তশালীদের এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘তুকাব্বর চাচার বর্তমানে চার ভাই ও বোন অন্ধ হয়ে গেছেন। আর তুকাব্বর চাচার এই অবস্থা। আমরা কয়েকজন মাঝে মাঝে কিছু সাহায্য করি, কিন্তু তা যথেষ্ট না। সরকারিভাবে সাহায্য পেলে পরিবারটির জন্য ভালো হবে। দেশের নাগরিক হিসেবে তুকাব্বর চাচারও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।’
এদিকে, তুকাব্বর শেখের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম মোর্তুজা বলেন, ‘রোগটি জেনেটিক কারণে হতে পারে। যেহেতু পারিবারিকভাবে তাদের সমস্যা রয়েছে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া রোগের ধরন বলা কঠিন। এমন দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসার জন্য যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে গেলে ভালো চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব, উন্নত চিকিৎসা হলে আবারও ভালো হয়ে উঠতে পারে।