
মফিজুর রহমান, বাঁকড়া (ঝিকরগাছা):সকালের ব্যস্ততা তখনো পুরোপুরি জমেনি। বাঁকড়া বাজারে সারি করে দাঁড়িয়ে পাঁচটি ঘোড়ার গাড়ি। আধুনিক যানবাহনের ভিড়ে দৃশ্যটি যেন অতীতের কোনো ছবি। সামনে ঘোড়া, পেছনে মালামাল বহনের কাঠামো। একসময় রাজা-বাদশাদের বাহন হিসেবে পরিচিত এই ঘোড়ার গাড়িই অনেক পরিবারের এখন জীবিকার অবলম্বন।
সময় বদলেছে। সড়কে বেড়েছে ট্রাক, পিকআপ, ভ্যানসহ নানা ধরনের যানবাহন। তবু বাঁকড়ার কিছু সরু, ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা পথে এখনো ঘোড়ার গাড়ির প্রয়োজন হয়। যেখানে বড় গাড়ি সহজে যেতে পারে না, সেখানে কৃষিপণ্য, ফসলসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে পৌঁছে যায় এসব গাড়ি।
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরোনো মাইক্রোবাসের চাকা ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয় ঘোড়ার গাড়ি। একটি গাড়ি তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। একটি ঘোড়া কিনতে লাগে আরও ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। দিনে আয় হয় প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। এই আয় দিয়েই চলে তাঁদের সংসার, সন্তানের পড়াশোনাসহ নানা খরচ।
এই ঘোড়ার গাড়ির চালকদের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়। সেখান থেকে পাঁচটি গাড়ি নিয়ে তাঁরা বাঁকড়া এলাকায় এসেছেন। পরিবার নিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে এখানেই মালামাল পরিবহনের কাজ করছেন। পাশের কলারোয়া উপজেলার খোর্দ ও দেয়াড়া এলাকা থেকেও মাঝেমধ্যে ঘোড়ার গাড়ি বাঁকড়ায় আসে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের মালামাল ও কৃষিপণ্য পরিবহনে এসব গাড়ি ব্যবহার করেন। দূরত্ব ও মালামালের ধরন অনুযায়ী ভাড়া নেওয়া হয়।
ঘোড়ার গাড়ির চাকা যখন কাঁচা-ভাঙা পথ পেরিয়ে এগিয়ে যায়, তখন তার সঙ্গে এগিয়ে চলে কয়েকটি পরিবারের জীবনও। একসময় রাজকীয় বাহন, তা জীবিকার বাহন। সময় বদলেছে, বদলায়নি প্রয়োজন।
আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে ঘোড়ার গাড়ি হারিয়ে যেতে বসেছে। তবু বাঁকড়ার পথঘাটে এখনো শোনা যায় ঘোড়ার খুরের শব্দ। ঐতিহ্যের সেই শব্দের সঙ্গে মিশে আছে কিছু মানুষের বেঁচে থাকার গল্প।