
ঘেরের পানি আটকে বিপাকে ৩ হাজার বিঘা জমির কৃষক, প্রশাসনের অভিযানে খুলল পানি নিষ্কাশনের পথ
কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি:যশোরের কেশবপুর উপজেলার বিদ্যানন্দকাটি ইউনিয়নের হারিয়ারগোপ গ্রামের হাজরা ও বেনাকুড়া বিল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ঘেরের পানি আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও পানি উঠে যায় মানুষের ঘরবাড়ির আঙিনায়। এতে একদিকে যেমন স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছিল, অন্যদিকে প্রায় ৩ হাজার বিঘা কৃষিজমির ধান চাষ ও আগামী মৌসুমের সরিষা চাষ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
স্থানীয় গ্রামবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ঘেরের পানি আটকে রাখার কারণে হাজরা ও বেনাকুড়া বিলের পানি স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারছিল না। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিলের পানি ধীরে ধীরে আশপাশের নিচু জমি ও বসতবাড়ির দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এতে কৃষকদের মধ্যে ফসলহানি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসার পর বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। এ সময় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ থাকার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পরে প্রশাসনের উপস্থিতিতে শিরাশুনি গ্রামের আতিয়ার মলঙ্গী, পিতা—মোঃ আবু বক্কার মলঙ্গীর ঘেরের বেড়ি কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়। বেড়ি কেটে দেওয়ার পর ঘেরের পানি বের হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এতে দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ হয়ে থাকা বিল এলাকার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করবে বলে আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঘটনাস্থলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা
জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিচালিত এ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন কেশবপুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ বিশ্বাস, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ আব্দুর রহমান শেখ, অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা ও বিদ্যানন্দকাটি ইউনিয়নের প্রশাসক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন।
এ ছাড়া কেশবপুর থানার পুলিশ সদস্য, আনসার-ভিডিপি বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন এবং জলাবদ্ধতার কারণ ও পানি নিষ্কাশনের বিষয়ে খোঁজ নেন। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ঘেরের বেড়ি কেটে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়।
৩ হাজার বিঘা জমি নিয়ে ছিল শঙ্কা
হাজরা ও বেনাকুড়া বিল এলাকার জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন কৃষকরা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ জমি কৃষিনির্ভর। পানি আটকে থাকলে চলতি মৌসুমের ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে সরিষাসহ অন্যান্য ফসল আবাদেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারত।
কৃষকদের আশঙ্কা ছিল, দীর্ঘদিন জমিতে পানি জমে থাকলে ধানের ফলন কমে যেতে পারে কিংবা জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে আগামী মৌসুমে সরিষা চাষের জন্য সময়মতো জমি প্রস্তুত করা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারত। বিশেষ করে বিল এলাকার নিচু জমিগুলোতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা ছিল।
ঘরবাড়িতেও পানি ওঠায় দুর্ভোগ
শুধু কৃষিজমি নয়, জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছিল স্থানীয় মানুষের বসতবাড়িতেও। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা না থাকায় অনেক বাড়ির আঙিনা ও চলাচলের পথ পানিতে ডুবে যায়। ফলে শিশু, বয়স্ক ও নারীদের চলাচলে ভোগান্তি বাড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পানি আটকে থাকায় তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছিল। বাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকায় অনেকেই নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হওয়ায় এখন তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
প্রশাসনের উদ্যোগে স্বস্তি
ঘেরের বেড়ি কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করায় স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা প্রশাসনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা বলেন, বিলের পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হলে কৃষিজমি দ্রুত শুকিয়ে যাবে এবং চাষাবাদ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বসতবাড়ি ও চলাচলের রাস্তায় জমে থাকা পানিও ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা করছেন তারা।
তাদের দাবি, শুধু তাৎক্ষণিকভাবে বেড়ি কেটে পানি নিষ্কাশন করলেই হবে না—ভবিষ্যতে যাতে কোনোভাবেই পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হলে বাড়ে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি
স্থানীয়দের মতে, বিল ও কৃষিজমির পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সচল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানি চলাচলের পথ কোনোভাবে বন্ধ হয়ে গেলে বর্ষা বা অতিবৃষ্টির সময় অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। এতে শুধু কৃষিজমি নয়, বসতবাড়ি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হাজরা ও বেনাকুড়া বিলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই আশঙ্কাকেই সামনে নিয়ে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগের পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসায় সরেজমিনে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঘেরের বেড়ি কেটে দেওয়ার পর পানি নিষ্কাশনের পথ উন্মুক্ত হওয়ায় বিল এলাকার কৃষকরা এখন স্বাভাবিক কৃষিকাজে ফেরার আশায় রয়েছেন। দ্রুত পানি নেমে গেলে চলতি ধান চাষের পাশাপাশি আগামী মৌসুমের সরিষা চাষও স্বাভাবিকভাবে করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে হাজরা ও বেনাকুড়া বিল এলাকায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে দ্রুত তা অপসারণ করা হবে।