
নিজেস্ব প্রতিবেদক মনিরামপুর : ভবদহ থেকে ফিরে এস এম তাজাম্মুলঃ অন্তরে অতৃপ্ত বাসনা এখন ভবদহ অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষের। বর্ষা এলেই আতঙ্ক ফিরে আসে ভবদহবাসীর জীবনে। জলাবদ্ধতার দুঃসহ অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়ানো মানুষের এবার আশায় বুক বেঁধেছিলো সর্বশেষ নদী খননে ১৪০ কোটি টাকার প্রকল্পের দিকে। কিন্তু বাস্তবতা সেই আশাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বৃষ্টির পানির সাথে।
টানা বর্ষণ ও নিম্নচাপের প্রভাবে যশোরের ভবদহ অঞ্চলের অন্তত ৫০টি গ্রাম ফের তলিয়ে গেছে পানির নিচে। ডুবে গেছে হাজার হাজার মাছের ঘের, পুকুর, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক সহ কয়েক হাজার হেক্টর জমি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অভয়নগর মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জলমগ্ন। শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ, কর্মজীবী মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত আর কৃষক ও মৎস্য চাষিদের চোখে শুধুই হতাশার ছাপ।
পরিবারের সঙ্গে কাটানো হাসিমাখা প্রতিটি রাত এখন বিষাক্ত পোকামাকড় ও সরীসৃপের আতঙ্কে ভীতিকর হয়ে উঠেছে ভবদহ বাসীর। নিরাপদে ঘুমানো কিংবা নিশ্চিন্তে বসবাস—দুটোই যেন এখন তাদের কাছে বিলাসিতা। সময়ের সাথে পানি নামলেও ক্ষত থেকে যায়,আর নতুন বর্ষায় সেই ক্ষত আরও গভীর হয়। দিন যত যাচ্ছে, মানুষের উদ্বেগও তত বাড়ছে। ক্ষুধার্ত পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, গবাদিপশু বাঁচানো—সব মিলিয়ে প্রতিটি পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছে। যেন প্রতিটি দিনই তাদের কাছে একেকটি কঠিন সংগ্রামের নাম। বর্তমানে বাঁশের তৈরি সাঁকো ও ছোট ছোট নৌকাই এলাকার মানুষের একমাত্র ভরসা। স্কুল, বাজার, মসজিদ কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে কোথাও যেতে হলে নৌকার বিকল্প নেই। অনেক জায়গায় সাঁকোও পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
খাদ্যসংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। অনেক পরিবার এখন খাল, বিল ও ডোবায় জন্মানো শাপলা এবং দেশীয় প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করেই জীবিকা নির্বাহ করছে। প্রতিদিন সকালে অধিকাংশ পুরুষ নৌকায় করে মাছ ধরতে বের হন।
শুধু মানুষই নয়, খাদ্যসংকটে রয়েছে গৃহপালিত অবলা পশু-পাখিও। খাদ্যের অভাবে অনেক গরু-ছাগল এখন নদী, খাল ও ডোবায় জন্মানো শ্যাওলা খেয়েই বেঁচে আছে। ফলে পশুপালনও মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।
বন্যার পানিতে এলাকার অধিকাংশ বিদ্যালয় তলিয়ে যাওয়ায় সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যেও বাড়ছে উৎকণ্ঠা।
আশংকাজনক হারে স্বাস্থ্যঝুঁকিও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে জন্ম নিচ্ছে বিষাক্ত ব্যাকটেরিয়া। একই সঙ্গে বেড়েছে মশা, মাছি ও বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের উপদ্রব। বিষাক্ত সরীসৃপের আতঙ্ক তো রয়েছেই। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কোমলমতি শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থ মানুষ।
বন্যার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পানিতে ডুবে থাকায় অনেক জায়গায় মাটি নরম ও আলগা হয়ে গেছে।মুসল্লিদের কোমর সমান পানি পেরিয়ে হেঁটে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতে হচ্ছে। কেউ নৌকায় করে মসজিদে পৌঁছাচ্ছেন। আবার অনেক বয়স্ক মানুষ পানির কারণে ঘর থেকেই বের হতে পারছেন না। ফলে তারা জামাতে নামাজ আদায় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এদিকে মাছের ঘেরগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চাষিদের লক্ষ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে। অনেক ঘেরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্ন ও বিনিয়োগ মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।
উল্লেখ্য, সেই আশির দশক হতে ৫০টি গ্রামের প্রায় ১০ লাখ মানুষ স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও পানিবন্দী দশার শিকার হয়ে আসছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহাসিক ও চরম জলাবদ্ধতাড়িত জনপদ ভবদহ অঞ্চলের ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। যশোর জেলার মণিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর এবং খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে অপরিকল্পিত স্লুইচ গেট নির্মাণ,নদী ভরাট এবং প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা নষ্ট হওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে এখানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এলাকার শত শত গ্রাম, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট বছরের পর বছর পানির নিচে ডুবে থাকে। জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগনদী পুনঃখননে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে এবং সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এ অঞ্চলের নদনদী ও খাল খনন কাজ চলছে।টিআরএম (TRM): তিলাই ও মুক্তেশ্বরী নদীর পানি নিষ্কাশন ও পলি ব্যবস্থাপনার জন্য টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (জোয়ার-ভাটা ব্যবস্থাপনা) পদ্ধতি চালুর কথা থাকলেও সে আশা ফিকে হয়ে গেছে ভবদহ বাসীর। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। যে কাজ এ বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো সুফল না মেলাতে ভুক্তভোগীরা চরম হতাশায় পড়েছে। শুধুই ১৪০ কোটি নই,ইতি পূর্বেও কয়েকটি প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও সমস্যা রয়ে গেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও বন্যায় ভবদহ অঞ্চলের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ধর্মীয় অনুশীলন—জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নেমে এসেছে স্থবিরতা। বছরের পর বছর একই দুর্ভোগের শিকার হলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে হতাশা।