
এস এম তাজাম্মুল,মণিরামপুরঃ বেহাল অবস্থা মণিরামপুর পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের ১২টি গ্রাম। ঝুকিপূর্ণ ব্রিজ,সোলার লাইটে জ্বলেনা আলো,অকেজো ড্রেনেজ ব্যবস্থা,নেই গণ-সৌচাগার,রাস্তার দূরবস্থা,প্রশ্নবিদ্ধ সাপ্লাই পানির বাড়তি মূল্য ! এভাবেই চলছে মণিরামপুর পৌরবাসীর নাগরিক সুবিধার বিপরীতে চরম ভোগান্তি। যদিও সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিমাসে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য গেজেটাকারে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করছে তার বিপরীতে সেবা নই বরং সাধারন মানুষের সাথে প্রহসনের মাধ্যমে ভোগান্তিতে ফেলছে মণিরামপুর পৌরসভার প্রকৌশলী শাখা !
আজকের অনুসন্ধানী এ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যশোরের মণিরামপুর পৌরসভা কর্তৃক সেবার নামে মানুষের সাথে প্রহসনের নাটকের বাস্তবচিত্র। কয়েকটি অর্থ বছরে একের পর এক প্রকল্প হলেও নাগরিক সুবিধায় সেই ভোগান্তিতেই পড়ে আছে পৌরবাসী। তবে জনগনের সেবার মান পরিবর্তন না হলেও পরিবর্তন হয়েছে পৌর কার্যালয় ও বেষ্টনীর,উন্নয়ন হয়েছে কর্মকর্তাদের অবস্থার,লেনদেন বেড়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক একাউন্টের।
সরেজমিনের চিত্র বলছে, মণিরামপুর পৌরসভার সাবেক প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিশাত তামান্না’র সময়ে কয়েকটি প্রকল্পের মধ্য পৌরভবনের সৌন্দর্য্য বর্ধন, নগর পরিচালনা ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (আইইউজিআইপি) সিসি ঢালায় রাস্তা ও ড্রেন নির্মান,মশক নিধোন বরাদ্দ, যানজট নিয়ন্ত্রণে লোকবল নিয়োগ সহ একাধিক ব্যাপারে অর্থ বরাদ্দের ১ বছর পরও হয়নি কোন উন্নয়ন।
এদিকে নতুন-পুরাতন সব ড্রেনেই পানি জমাতে কোটি কোটি মশার ডিম্বানুতে এখন মশার অভয়-আশ্রমে পরিনত হয়েছে। ২টি অর্থবছরে পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের ড্রেনের পরিমান বাড়লেও সেটা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থায় পৌরবাসীর ভোগান্তি এখন চরমে। মণিরামপুর পৌরসভার মোহনপুর-তাহেরপুর ও মোহনপুর-বিজয়রামপুর ওয়ার্ডের এলজিইডির নির্মানকৃত ২টি ব্রিজ ঝুকিপূর্ণ এবং ব্রিজ হতে পড়ে আহতের খবর কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হলেও নেওয়া হয়নি ব্যাবস্থা।
তথ্য অনুযায়ী,মণিরামপুর পৌরসভার প্রকৌশল শাখার ব্যবস্থাপনায় নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ২টি বৃহৎ প্যাকেজের ১ম টিতে ১৪ কোটি টাকার প্রকল্পে ৬০৯২ মিঃ রাস্তা ও ২২৩১ মিঃ ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ আংশিক হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে এ সমস্ত প্রকল্পের। অফিসিয়াল নির্দেশে বর্তমানে স্থগিত আছে ও চলতি এ প্রতিবেককে তার বিরুদ্ধে নিউজ না করতে হুমকিও প্রদান করেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মোঃ আসাদুজ্জামান রয়েল। এ দিকে সদ্য শুরু হওয়া ২য় প্রকল্পের ১৬ কোটি টাকার টেন্ডারের চলমান কাজেও চলছে ধীরগতি। এদিকে বেশি ভোগান্তি পরিলক্ষিত হয়েছে,কোভিড-১৯ এর প্রকল্পের আওতায় শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে হতে দূর্গাপুর ওয়ার্ডে চলমান ড্রেনের কাজের জন্য ঠিকাদার প্রায় ১ বছর আগে মাটি খুড়ে রাখাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাতায়তে বিড়ম্বনায় বেচাকেনায় মন্দার পাশাপশি পৌরবাসির যাতায়ত ও রাস্তায় ভাংগন ধরতে দেখা গেছে।এ দিকে পৌর বেষ্টনীর পার্শ দিয়ে ২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,পাবলিক লাইব্রেরি ও মোহনপুর ওয়ার্ডবাসীর যাতায়াত রাস্তা এখন ছোট খাটো ডোবায় পরিনত হয়েছে।নির্মানাধীন ড্রেনের নেই ঢাকনা,যার পরিপেক্ষিতে কোমলমতী শিক্ষার্থী সহ সাধারণ মানুষকে ঝুকিপূর্ণ ভাবে চলাচল করতে হচ্ছে। এ ছাড়াও ৯টি ওয়ার্ডের নির্মানকৃত প্রায় অর্ধশত ড্রেনের প্রবেশদ্বার ও হরিহর নদীর সম্মুখদ্বারের আগে ময়লা আবর্জনার ভরাটে পানি জমে বদ্ধ জলাশয়ে রূপ নিয়েছে। মাসের পর মাস ড্রেনে পানি জমে দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে,হচ্ছে পরিবেশ দূষন,ছড়াচ্ছে রোগজীবাণু।
ক্ষোভ ও অনাস্থা প্রকাশ করে পৌরসভার পেছনে পাবলিক লাইব্রেরি সংলগ্ন প্রভাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিএম মাকসুদুর রহমান জানা,আমাদের ভোগান্তির শেষ নাই। আমার প্রতিষ্ঠানের সামনে তো এখন বৃষ্টি হলেই পানি জমে,বাচ্চারা ঠিকঠাক যাতায়ত করতে পারেনা,পৌরসভাকে বারবার বলেও কোন সমাধান হয়নি। একটা ক্ষতি হলে তার দায় নিবে কে? ভোগান্তিতে আছে ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান,বাসাবাড়ি,অফিসপাড়া সহ প্রতিটি পরিবেশে মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ সেবা গ্রহীতারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মোতাবেক, মশার বংশ বিস্তারের জন্য দীর্ঘদিনের আবদ্ধ জলাশয়ে মশার উপদ্রব ও আবাস্থলের উপর ভিত্তি করে জলাশয়ের আশপাশেই এডিস মশার ভ্রূণ বহনকারী মশা কাউকে কামড় দেই সেক্ষেত্রে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
ভোগান্তীর আরেকটি কারন যানজট ও ফুটপাত! মণিরামপুর বাজারে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও ফুটপাত দখলে প্রায়ই দেখা যায় যানজট। একনেকে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প হয়ে রাস্তা সংস্কার হলেও চওড়া হয়নি। সরকার পরিবর্তন হয়েছে,জনপ্রতিনিধি পরিবর্তন হয়েছে,শুধু পরিবর্তন হয়নি মণিরামপুর পৌরসভার কর্মকর্তাদের চেয়ার। সেখানেই ভোগান্তিতেই পড়ে আছে মণিরামপুর বাসী। প্রশ্ন থেকে যায় কার, স্বার্থে এই পরিকল্পনা! তবে সম্প্রতি যানজট নিরসনে ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে কিছুটা স্বস্তির হাওয়া দিয়েছে উপজেলা ও পৌর প্রশাসন।
মণিরামপুর পৌরসভার তত্বাবধানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, যানজট নিয়ন্ত্রণে লোকবল নিয়োগ দিলেও সিসির কন্টোলরুমে ফুটেজ চাইলেও পাওয়া যায়না কোন রেকর্ড আর যানজট নিয়ন্ত্রণের সেই লোকবলের ছায়া মেলেনা পৌরশহরের কোথাও। এলজিইডি ও জাইকার সহযোগিতায় শত শত ডাস্টবিন পৌর বাসীকে দেওয়া হলেও অসংখ্য ডাস্টবিনে আগাছা উঠতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ডাস্টবিনের ময়লা নিয়মিত না নেওয়াতে ময়লাখানায় পরিনত হয়েছে। এখানেও সেই স্বাস্থ্য ঝুঁকি! কাগজ কলমে ৬টি সরকারি শৌচাগার সচল থাকলেও এত বড় একটি পৌরসভায় নাই কোন স্বক্রিয় গণ-শৌচাগার। পানি মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও মণিরামপুর পৌরসভার সাপ্লাই ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ! পানিতে আয়রন, দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে রোগজীবানুর আতংকের সাথে মাঝে মাঝে পানির লাইনই বন্ধ থাকতে দেখা যায়। তবে নিয়মিত রশিদ সহকারে আগের বিল বাসা প্রতি ১শ হতে ১৫০ টাকা থাকলেও বর্তমানে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার পানির বিল আদায় করে কর্তৃপক্ষ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, পৌরসভার এক কর্মচারির নিজের বাড়ির রাস্তা ও পানির লাইনের সেবা হতে ২০০১ সালের পর হতে বঞ্চিত আছেন বলে এ প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেছেন।
পৌরসভার এ সমস্ত সার্বিক বিষয়ে বারবার মিটিং করে কমিটি নির্বাচন হলেও খাতা কলমেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ! বাস্তবে নেওয়া হয়না কোন পদক্ষেপ। মণিরামপুর পৌরসভার এহেন জন-ভোগান্তির কার্যকলাপে রীতিমতো অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে পৌরবাসী। এ সমস্ত সমস্যার সমাধান অতি দ্রুত সময়ে না হলে ঝুকিপূর্ণ যাতায়ত ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির পাশাপাশি পরিবেশ দূষনের নগরীতে মণিরামপুর পৌরশহর পরিনত হবে বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন মহল।
বাইরের ঠিকাদার কাজ পেলেও স্থানীয় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে কয়েকজন ঠিকাদার এ সমস্ত কাজ নিজেদের আওতায় রেখে কাজ করার সুবাদে বেশি জটিলতা দেখা দিয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে কাজ বুঝে নিতে বেগ পেতে হয় বলে জানিয়েছে মণিরামপুর পৌরসভার প্রকৌশলী কর্মকর্তা উত্তম মজুমদার।
প্রশ্নবিদ্ধ উল্লেখিত প্রকল্পের পৌর বেষ্টনীর পার্শরাস্তা ও ড্রেনের সমান্তরাল জটিলতায় ৬ ইঞ্চি ঢালায়ের পরিবর্তে ১৮ ইন্চি অর্থাৎ বাড়তি ১২ ইঞ্চি ঢালায়ের নির্দেশ সহকারে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়াও চলমান প্রকল্পের প্রত্যেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ জনস্বার্থে দ্রুত সময়ে শেষ করার ইতিমধ্যে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান,মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মোঃ সম্রাট হোসেন।