বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ভাঙ্গায় ১০০ পিস ইয়াবাসহ স্বামী-স্ত্রী গ্রেপ্তার বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ,পায়রাসহ চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত ডুমুরিয়ায় ইউআরসি অফিসার মোসলেম আলীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ কেশবপুরে হারিয়ে যেতে বসা মাটির শিল্পে এখনো বেঁচে আছে বাংলার ঐতিহ্য যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত সাংবাদিক মোঃ শিহাব উদ্দিনের বড় ছেলে ইসমাইলের ১৭তম জন্মদিন কোটচাঁদপুরের সাংবাদিকতায় নক্ষত্রপতন, না ফেরার দেশে শেখ নজরুল ইসলাম ভাঙ্গা থানায় পরিত্যক্ত মোটরসাইকেল ও পিকআপ, মালিকের সন্ধান চায় পুলিশ শ্যামনগরে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা ডুমুরিয়ায় ইউআরসি অফিসার মোসলেম আলীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ

কেশবপুরে হারিয়ে যেতে বসা মাটির শিল্পে এখনো বেঁচে আছে বাংলার ঐতিহ্য

  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৬ বার পড়া হয়েছে

টিকে থাকার লড়াইয়ে কুমাররা, প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা

ইমরান হোসেন, কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি:একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ছিল মাটির হাঁড়ি, পাতিল, সরা, কলস, জগ, মগ ও থালা-বাসন। রান্নাঘর থেকে শুরু করে গৃহস্থালির নানা কাজে মাটির তৈরি সামগ্রী ছিল মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের সামগ্রী। ফলে যশোরের কেশবপুরে বংশপরম্পরায় চলে আসা ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প এখন টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ে।

তবে একেবারে হারিয়ে যায়নি মাটির তৈরি পণ্যের কদর। কেশবপুরের স্থানীয় বাজারে এখনো ছোট-বড় প্রায় শতাধিক ধরনের মাটির সামগ্রীর বেচাকেনা হচ্ছে। হাঁড়ি, পাতিল, প্লেট, মগ, ফুলদানি, টব, জগ থেকে শুরু করে পয়সার ব্যাংক বিভিন্ন পণ্য নিয়ে কোনো রকমে টিকে আছেন মৃৎশিল্পী ও ব্যবসায়ীরা।

৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, স্থানীয় বাজারের প্রবীণ মৃৎশিল্পী ও ব্যবসায়ী ব্রুয় দাস পাল জানান, প্রায় ৮০ বছর ধরে তিনি এ পেশার সঙ্গে যুক্ত তার দোকানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০ ধরনের মাটির তৈজসপত্র বিক্রি হয়। ১০ টাকার পয়সার ব্যাংক থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা দামের বিশেষ পানি খাওয়ার জগও রয়েছে। এর মধ্যে দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত ঝিলে সরা ও চিতই পিঠা তৈরির খোলাও তুলনামূলক ভাবে বেশি বিক্রি হয়।

তিনি জানান, মাটির সামগ্রীর বড় একটি অংশ যশোরের দায়তলা থেকে পাইকারি দরে আনা হয়। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও কিছু পণ্য সংগ্রহ করা হয়। পরিবহন, দোকান পরিচালনা ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে দিনে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ হয়। এই সামান্য আয় দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালাতে হচ্ছে। মৃৎশিল্পের প্রধান কাঁচামাল মাটি কিন্তু উপযুক্ত দোআঁশ ও এঁটেল মাটি এখন আগের মতো সহজে পাওয়া যায় না। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে চড়া দামে মাটি কিনে আনতে হচ্ছে কারিগরদের। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, আর তার প্রভাব পড়ছে মাটির তৈরি পণ্যের দামের উপর।

এছাড়া বর্ষা মৌসুমেও রয়েছে বাড়তি দুর্ভোগ! পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় মাটির তৈরি পণ্য শুকানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ব্যাহত হয় উৎপাদন। অথচ বর্ষাকালে মাটির তৈরি কিছু নির্দিষ্ট পাত্রের চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকে। বর্তমানে কেশবপুরের আলতাপোল পালপাড়া ও ব্রহ্মকাটি এই দুই গ্রামের পাল ও কুমার সম্প্রদায়ের মানুষ বংশপরম্পরায় পাওয়া মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য এখনো অব্দি ধরে রেখেছেন। কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর এ পেশায় আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে জীবিকার তাগিদে কেউ কেউ অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন আবার কেউবা সংসারের হাল ধরতে ছুটে যাচ্ছে বিভিন্ন শহরমুখে। এতে করে ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে দক্ষ কারিগরের সংকটও।

প্লাস্টিকের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় স্থানীয় ব্যবসায়ী রতন পাল বলেন, প্লাস্টিকের সামগ্রী তুলনামূলক সস্তা, সহজে বহনযোগ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে মাটির পাত্রের ব্যবহার কমেছে। ফলে আগের মতো নেই মাটির পণ্যের কদর ও চাহিদা মতো বাজার।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, মৃৎশিল্পীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় সহায়তা পর্যাপ্তভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। চাহিদা কমার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে এ পেশায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। শখ ও পরিবেশ সচেতনতায় ফিরছে মাটির পণ্য তবে মাটির পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। পার্শ্ববর্তী উপজেলা ডুমুরিয়া থেকে কেশবপুর বাজারে মাটির সামগ্রী কিনতে আসা হাবিবুল্লাহ জানান, নিত্য ব্যবহারের জন্য নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিক হওয়ায় তিনি মাটির তৈরি প্লেট ও মগ কিনছেন।
পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঘর সাজানোর নান্দনিক প্রবণতার কারণে মাটির তৈরি ফুলদানি, টব, মগ, প্লেটসহ বিভিন্ন পণ্যের নতুন বাজার তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আধুনিক নকশা, মানসম্মত পণ্য এবং কার্যকর বাজারজাতকরণে গুরুত্ব দেওয়া গেলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয় করা সম্ভব।

পৃষ্ঠপোষকতা চান মৃৎশিল্পীরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, মৃৎশিল্প গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার চাপে এই শিল্প হারিয়ে যাওয়া কাম্য নয়।

মৃৎশিল্পীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব মাটির পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

কেশবপুর নিউজ ক্লাবের সভাপতি মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি কেশবপুরের লোকজ ঐতিহ্যের অংশ। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে এই শিল্পকে আধুনিক বাজারের উপযোগী করে তুলতে হবে। কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং মাটির পণ্যের প্রচার ও বাজারজাতকরণে উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসা জরুরি।

হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় সংশ্লিষ্টদের মতে, প্লাস্টিক ও অন্যান্য আধুনিক সামগ্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে মাটির পণ্যের বাজার ধরে রাখা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।

মৃৎশিল্পীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত কাঁচামালের সরবরাহ এবং স্থায়ী বাজার নিশ্চিত করা গেলে কেশবপুরের হারিয়ে যেতে বসা এই লোকশিল্প নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে। অন্যথায় প্লাস্টিকের অব্যাহত দাপট আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা কুমারদের এই পেশা একদিন হয়তো শুধু স্মৃতির পাতাতেই ঠাঁই নেবে।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews