
ইমরান হোসেন, কেশবপুর প্রতিনিধি:যশোরের কেশবপুরের প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বিরল প্রজাতির কালোমুখ হনুমান। বছরের পর বছর ধরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবাধ বিচরণ করে আসা এই প্রাণীগুলো একসময় ছিল কেশবপুরের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু বনজ সম্পদ কমে যাওয়া, প্রাকৃতিক খাদ্যের সংকট এবং লোকালয়ে নানা ঝুঁকির কারণে এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রাণী।
কেশবপুর ও পার্শ্ববর্তী মণিরামপুর উপজেলার অন্তত ১২টি এলাকায় কালোমুখ হনুমানের বিচরণ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে এলাকায় চার শতাধিক হনুমান রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে গণনা না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিশ্চিত নয়।
প্রাকৃতিক পরিবেশে খাবারের সংকট তৈরি হওয়ায় এখন প্রায়ই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে হনুমান। কখনো বসতবাড়ি, কখনো দোকান কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে খাবারের সন্ধান করছে তারা। বিস্কুট, চিপসসহ বিভিন্ন খাবার নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এখন অনেকটাই পরিচিত হয়ে উঠেছে স্থানীয়দের কাছে।
হনুমানের খাদ্য সংকট মোকাবিলায় বন বিভাগ থেকে নিয়মিত কলা, পাউরুটি, বাদাম ও সবজি সরবরাহ করা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, হনুমানের সংখ্যা ও বিস্তৃত বিচরণ এলাকার তুলনায় এই খাদ্য সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। সব এলাকাতেও নিয়মিত খাবার পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
আর খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে আসাই অনেক সময় কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে এসব প্রাণীর জন্য। বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে হনুমান। কেউ কেউ আবার আহত হচ্ছে বিভিন্ন দুর্ঘটনায়। এতে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও নিরাপদ বংশবিস্তারের পরিবেশও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে আহত একটি কালোমুখ হনুমান কেশবপুরের ত্রিমোহিনী মোড়ে এসে মানুষের সহায়তা নিয়ে একটি ফার্মেসি থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করে। আহত প্রাণীটির প্রতি মানুষের এই সহমর্মিতা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—কালোমুখ হনুমান শুধু একটি বন্যপ্রাণী নয়, এটি কেশবপুরের প্রকৃতি ও ঐতিহ্যেরও অংশ।
কেশবপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অলোকেশ কুমার সরকার জানান, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুটি হনুমানের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া আহত কয়েকটি হনুমানকে চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা সমীরণ বিশ্বাস জানান, কেশবপুরে সাম্প্রতিক সময়ে কালোমুখ হনুমানের সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে চার শতাধিক হনুমান রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে গণনা করা হলে প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে।
ঐতিহ্যবাহী বিরল প্রজাতির কালো মুখ হনুমান এর অস্তিত্ব রক্ষার্থে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, শুধু খাবার সরবরাহ করলেই কালোমুখ হনুমানকে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা এবং নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র তৈরি করা।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু ঠেকাতে হনুমানের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিদ্যুৎ লাইনে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি যে এলাকাগুলোতে তাদের নিয়মিত বিচরণ রয়েছে, সেখানে গাছপালা ও খাদ্যদায়ী গাছ সংরক্ষণ ও নতুন করে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এছাড়া বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত সংরক্ষণ পরিকল্পনা করা হলে এই প্রাণীগুলোকে নিরাপদ রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ কেশবপুরের কালোমুখ হনুমান শুধু একটি বিরল প্রাণী নয়—এটি এই জনপদের দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজ তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও কেশবপুরের এই ঐতিহ্যকে দেখতে পারবে। আর এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে একদিন হয়তো কেশবপুরের পরিচিত এই কালোমুখ হনুমান শুধু গল্প আর স্মৃতিতেই থেকে যাবে।