
বিশেষ প্রতিবেদক: যশোরের নীলগঞ্জে ‘ড্রিম টাচ একাডেমি’ নামক কোচিং সেন্টার থেকে মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। যার কারণে দফায় দফায় আশ্বাস দিলেও ওই কোচিং সেন্টারের কর্ণধার মাসুদুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যশোরের জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপের জোর দাবি উঠেছে।
প্রগতি বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাসুদুর রহমানকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হলেও নিশ্চুপ রয়েছেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন যাবত প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুদুর রহমানের নেতৃত্বে নীলগঞ্জ ব্রিজ সংলগ্ন ‘ড্রিম টাচ একাডেমি’ নামক একটি কোচিং সেন্টার পরিচালিত হয়ে আসছে। এর আগে তিনি ‘অর্কিড’ নামক কোচিং সেন্টার পরিচালনা করতেন। স্কুল শিক্ষকের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে তিনি শুধু কোচিং বাণিজ্যই করছেন না, বরং স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকদের নিয়ে সিন্ডিকেট করে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছেন। ওই কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে জিম্মি করা ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে। তার সাথে সংশ্লিষ্ট স্কুলের একাধিক শিক্ষক ওই কোচিং সেন্টারে নিয়োজিত আছেন। মাসুদুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে তোলা ওই শিক্ষক সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছে রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়েছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাধাকান্ত বিশ্বাস। রাগ ও ক্ষোভে তিনি এক সময় চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
ওই স্কুলে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক আছেন। কিন্তু তাকে দিয়ে ইংরেজি ক্লাস নেওয়া হয় না। মাসুদুর রহমান সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক। কোচিং বাণিজ্যের সুবিধার্থে মাসুদুর রহমান জোর করে ইংরেজি বিষয়ের ক্লাস নেন। তিনি যে ইংরেজি শিক্ষক নন, সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক—সেটা স্কুলের শিক্ষার্থীরাও জানে না।
কোচিং সেন্টারের মাসুদুর রহমান ছাড়াও গণিতের শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম ও লাইব্রেরিয়ান তাপস কুমার ঘোষ বর্তমানে ‘ড্রিম টাচ’ কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিচ্ছেন। এ নিয়ে সম্প্রতি একাধিক পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সংবাদ বন্ধের জন্য দেন-দরবার করছেন কোচিং সেন্টারের কর্ণধার মাসুদুর রহমান।
কয়েকদিন যাবত কোচিং সেন্টারে না গিয়ে নিজ বাড়িতে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন।
এদিকে ড্রিম টাচ কোচিং সেন্টার নিয়ে তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে দুর্নীতি ও অনিয়মের ভয়াবহ খবর । যশোরের সাবেক জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রবিউল ইসলামকে মাসোহারা দিয়ে কোচিং সেন্টার পরিচালনা করতেন মাসুদুর রহমান। তিনি বদলী হয়ে গেলেও বর্তমান জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে বিষয়টি সমন্বয় করে গেছেন । সেই ধারাবাহিকতায় জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে মাসোহারা দিয়ে তিনি এ কোচিং সেন্টার পরিচালনা করে আসছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যার কারণে নানা অপকর্ম করা সত্ত্বেও ড্রিম টাচ কোচিংয়ের
বিরুদ্ধে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে কোন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু মাসুদুর রহমান পরিচালিত কোচিং এর ক্ষেত্রে তা কার্যকর করা হচ্ছে না। এমনকি ‘ড্রিম টাচ’ কোচিং সেন্টার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হলেও এখনো পর্যন্ত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। শুধুমাত্র প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাধাকান্ত বিশ্বাস মাসুদুর রহমানকে একটি কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছেন। তবে ওই নোটিশের দায়সারা জবাব দিয়ে ধুরন্ধর শিক্ষক মাসুদুর রহমান রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। গত ০৭/০৭/২০২৬ তারিখে দেওয়া ওই জবাবে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে অব্যাহতি চেয়েছেন। প্রধান শিক্ষক রাধাকান্ত বিশ্বাস স্বাক্ষরিত স্মারক নং-২৩/২৬ এর চিঠির প্রেক্ষিতে মাসুদুর রহমান জবাবে উল্লেখ করেন, গত ১৯/০৪/২০২৬ তারিখে ঢাকার জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় তার নেতৃত্বে পরিচালিত “ড্রিম টাচ একাডেমি” নামক কোচিং সেন্টারে কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, “ড্রিম টাচ একাডেমি” নামক প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিষ্ঠানটি মূলত একজন অশিক্ষক কর্তৃক পরিচালিত।
প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা এবং পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্সের সাথেও তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ওই একাডেমির সাথে জড়িত নন এবং কোনো শিক্ষার্থীকে সেখানে পড়ার জন্য উৎসাহিতও করেন না।
কোচিং সেন্টারের সাথে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে উল্লেখ করলেও ওই নোটিশের জবাবের সাথে তিনি ‘ড্রিম টাচ’ কোচিং-এর ট্রেড লাইসেন্স, বাড়ি ভাড়ার চুক্তিনামার ফটোকপি সংযুক্ত করে দিয়েছেন। বিষয়টা “ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না”—অবিকল সেই রকম। যদি কোচিং সেন্টারের সাথে তার কোনো সংশ্লিষ্টতাই না থাকে, তবে ওই প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স ও বাড়িভাড়ার চুক্তিনামা কার নামে, তিনি তার ফটোকপি কিভাবে পেলেন? আর কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে তিনি তা কেনই বা সংযুক্ত করে দিলেন? এ সমস্ত প্রশ্নের কোনো উত্তর মিলছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাসুদুর রহমানের শ্যালক সাইফুজ্জামানের নামে কোচিং সেন্টারের বাড়ি ভাড়ার চুক্তিনামা ও ট্রেড লাইসেন্স করা। কিন্তু কোচিং সেন্টার পরিচালনা মাসুদুর রহমান নিজেই করে থাকেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের কাছে তিনি কোচিং সেন্টারের পার্টটাইম শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত আছেন বলে স্বীকারও করেছেন। যার রেকর্ড সংরক্ষিত আছে।
কোচিং-এর সাথে যদি তার কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকে, তবে প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে ৬টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত তিনি কোচিং-এ কেন থাকেন?
একজন ম্যাজিস্ট্রেটের ভাগ্নিকে কোচিং-এ পড়ানো নিয়ে কেন বিতর্কে জড়ালেন? এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মিলছে না।
২০১২ সালের কোচিং নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক স্কুলে কোচিং করাতে পারবেন। কিন্তু বাইরে কোনো কোচিং-এর সাথে জড়িত হতে পারবেন না। কিন্তু মাসুদুর রহমান শুধু ক্লাস করাচ্ছেন না, স্কুলের সহকারী শিক্ষকদের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নানান অনিয়ম করে যাচ্ছেন। কারণ দর্শানো নোটিশের জবাবে মাসুদুর রহমান আরও বলেন, তিনি দীর্ঘদিন যাবত নিজ যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে সম্মান ও সুনামের সাথে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন। একটি স্বার্থান্বেষী মহল তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এই ধরনের ভিত্তিহীন ভুল তথ্য সংবাদপত্রে প্রকাশ করেছে। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন। তিনি কোচিং বাণিজ্য নীতিমালা-২০১২ পরিপন্থী কোনো কর্মকাণ্ডের সাথেও জড়িত নন।
সর্বশেষে তিনি প্রধান শিক্ষকের কাছে দাখিলকৃত জবাব ও প্রমাণাদির ভিত্তিতে তাকে উক্ত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি প্রদানের জন্য সবিনয় অনুরোধ করেন।