
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ২৩ এপ্রিল ২০২৬ : চৈত্রের অসহনীয় তাপপ্রবাহের মধ্যে দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের ঘাটতিতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলাকাভেদে দিনে ৩ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে। এর সরাসরি ধাক্কা লেগেছে শিল্প-কলকারখানায়, আর চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ, বৃদ্ধ ও শিশুরা।
শ্রমজীবীদের জীবন দুর্বিষহ তীব্র গরমে রিকশাচালক, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক ও ফুটপাতের হকারদের আয় কমে অর্ধেক হয়ে গেছে। দুপুরের কাঠফাটা রোদে কাজ করতে না পেরে অনেকেই বিশ্রাম নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু বাসায় ফিরেও স্বস্তি নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরের ফ্যান চলে না, মোটর বন্ধ থাকায় পানিও মেলে না।
গাজীপুরের পোশাক শ্রমিক রাহেলা বেগম জানান, “কারখানায় কারেন্ট গেলে গরমে বইসা থাকা যায় না। আবার ওভারটাইমও বন্ধ। মাস শেষে বেতন কম আসবে। বাসায় বাচ্চাটা সারারাত কান্দে গরমে।”
শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশাল ঘাটতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উৎপাদনশীল খাত। বর্তমানে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৩ হাজার মেগাওয়াট। এই ঘাটতি মেটাতে দিনের পিক আওয়ারে শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মালিকরা বলছেন, জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন ধরে রাখতে গিয়ে খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জের একটি নিট কারখানার মালিক জানান, “ডিজেলের দাম বেশি। দিনে ৫-৬ ঘণ্টা জেনারেটর চালাইলে পোষায় না। অর্ডার ক্যানসেল হইতেছে। শ্রমিক ছাঁটাই ছাড়া উপায় নাই।”
বৃদ্ধ ও শিশুদের হাঁসফাঁস অবস্থা টানা লোডশেডিং আর প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে বৃদ্ধ ও শিশুরা। হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগী বাড়ছে।
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এই গরমে বিদ্যুৎ না থাকলে শিশুদের পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে।”
সংকটের মূলে জ্বালানি ঘাটতিতে পেট্রোবাংলা ও পিডিবি সূত্র জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অনিয়ন্ত্রিত দাম এবং দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন কমে যাওয়াই এই সংকটের প্রধান কারণ। পূর্ববর্তী বকেয়া ঋণ এবং এলএনজি আমদানি কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে।
সরকার বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের কথা বললেও মাঠ পর্যায়ে এখনো তার প্রভাব পড়েনি। জরুরি ভিত্তিতে সাবস্টেশন আধুনিকায়ন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং বন্টনে স্বচ্ছতা না আনলে এই দুর্ভোগ আরও দীর্ঘ হবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।