
পাপন চৌধুরী;ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেত শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে। একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত এই শিল্প এখন আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যেতে বসেছে। তবুও উপজেলার ৫ নম্বর এলাঙ্গী ইউনিয়নের দাস সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার এখনো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তাদের পূর্বপুরুষদের এই পেশা।
একসময় বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি হতো নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী—চাটাই, কুলা, ডালা, চালুনি, খাঁচা, মুড়া, গোলা, সুড়ি, পাটি ও বিভিন্ন ধরনের ঝুড়ি। এসব পণ্যের চাহিদা ছিল ব্যাপক, আর এ শিল্পকে ঘিরেই স্বাবলম্বী ছিলেন শত শত পরিবার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলজাত পণ্যের দাপটে সেই কদর আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোটচাঁদপুর উপজেলার ফাজিলপুর গ্রামে একসময় অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার এই পেশার সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমানে নানা সংকটের কারণে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় শতাধিক পরিবারে। ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, কাঁচামালের উচ্চমূল্য এবং বাজারে কম চাহিদার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন।
ফাজিলপুর গ্রামের কারিগর সুমন কুমার দাস জানান, “বাবার কাছ থেকে শেখা এই পেশা আমাদের বংশপরম্পরায় চলে আসছে। এখন আর আগের মতো আয় নেই, তবুও আমরা ছাড়তে পারছি না।”
একই গ্রামের বকুল কুমার দাস বলেন, “বাজারে চাহিদা কম, দামও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। একটি ঝাপি ১৫০ টাকা, টেপারি ১৪০ টাকা, চ্যাঙারি ২৪০-২৫০ টাকা, পেতে ১০০ টাকা, চালুনি ১৫০ টাকা, পলো ৫০০ টাকা এবং চাটাই পাইকারিতে ৪৫০ টাকায় বিক্রি করি। কিন্তু একটি বাঁশ কিনতেই লাগে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা।”
স্থানীয় রবিদাস জানান, পরিবারের সদস্যরা বাড়ির কাজের পাশাপাশি এই কাজে সহায়তা করলেও আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. এনামুল হাসান বলেন, “বাঁশ-বেত শিল্প আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য। এটি টিকিয়ে রাখা জরুরি। যারা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত, তারা যোগাযোগ করলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ না নিলে অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প। তবুও সব প্রতিকূলতার মাঝেও এলাঙ্গীর দাস সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার এখনও আশা ছাড়েনি—বাঁশের বুননে তারা আঁকড়ে ধরে আছে তাদের অস্তিত্ব ও ঐতিহ্য।