
এস এম তাজাম্মুল,মণিরামপুরঃ স্ত্রীর পরকীয়া জানতে পেরে ২টি সন্তানের কথা চিন্তা করে ১২দিন আগে বন্ধুর সাথে নিজের স্ত্রীকে বিয়ে দিয়েছেন,স্বাক্ষীর স্থলে স্বাক্ষর করেছেন কাবিননামায়,তারপর থেকে চলছিল পারিবারিক কলহ! নিজের মনের সাথে যুদ্ধ, অবশেষে মিলল ওই যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ।
হৃদয়বিধারক হলেও গত রবিবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কাশিমনগর মান্দার তলায় এ ঘঠনাটি ঘটেছে। মৃত ঐ যুবক আব্দুল্লাহ মিথুন (২৮) এলাকার মশিয়ার রহমানের ছেলে।
আব্দুল্লাহর স্বজনদের দাবি, স্বামী ও ২ ছেলে সন্তান থাকতে আব্দুল্লার স্ত্রী সাথী (২৬) পরকীয়া করে সুমন নামে মালয়েশিয়ান প্রবাসী এক যুবককে মোবাইল ফোনে বিয়ে করেছেন। এরপর পথ পরিষ্কার করতে নানাভাবে নির্যাতন দিয়ে সাথী আব্দুল্লাহকে হত্যা করেছে।
আব্দুল্লাহর চাচা এনায়েত হোসেন বলেন, আব্দুল্লাহ’র স্ত্রী সাথী ১৫ থেকে ২০ দিন আগে সুমন নামে একটা ছেলেকে বিয়ে করেছে। এরপর সুমনের পরামর্শে সাথী আব্দুল্লাহকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে। আমরা সুমন ও সাথীর বিচার চাই।
আজ সোমবার সরেজমিন জানা গেছে, নির্মাণ শ্রমিক আব্দুল্লাহ ১০ বছর আগে একই উপজেলার মধুপুর গ্রামের সাথী নামে এক নারীকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন। সেই ঘরে তাদের ৬ বছর ও ৪ বছর বয়সী দুই ছেলে রয়েছে। তাদের সংসার ভালই চলছিল।
আব্দুল্লাহর বন্ধু ও প্রতিবেশী ভাই সুমন একসাথে বড় হয়েছেন। সেই সূত্রে বন্ধুর স্ত্রী সাথীর সাথে সুমনের পরিচয়। চার বছর আগে সুমন মালয়েশিয়ায় চলে যান। পরে দেশে এসে কয়েকদিন বাড়িতে থেকে তিন মাস আগে মালয়েশিয়ায় চলে যান তিনি।
এলাকাবাসী জানান, সুমনের সাথে সাথীর পরিচয় পরকীয়ায় গড়ায়। যা টের পেয়েছিলেন আব্দুল্লাহ। স্ত্রীকে অনেক বুঝিয়ে ফেরাতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে নিজে উপস্থিত থেকে কাজী অফিসে নিয়ে স্ত্রীকে সুমনের সাথে বিয়ে দিয়েছেন আব্দুল্লাহ।
আব্দুল্লাহর মা রওশনারা বলেন, এসব কিছু আমরা জানতে পারিনি। আমার ছেলেরে মানসিকভাবে চাপ দিত ওর বউ। রোববার রাতে ওদের মধ্যে ঝগড়া হয়। কিছুক্ষণ পরে বউ দৌঁড়ে এসে বলে আমার ছেলে আত্মহত্যা করেছে। আমার ধারণা, বউ গলায় গামছা জড়ায়ে আমার ছেলেরে মেরে ফেলেছে। পরে লাশ বারান্দায় আড়ার সাথে ঝুলিয়ে রেখেছে।
আব্দুল্লাহর মৃত্যুর খবরে প্রতিবেশীরা ছুটে আসলে স্বামীর লাশ রেখে ঘরে ঢুকে দরজা আটকে বসে থাকেন সাথী। পরে দরজা ভেঙ্গে তাকে বের করে আনা হয়, বলেন একজন প্রতিবেশী।
আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু পল্লি চিকিৎসক মুবাসসের আল মু্বিন বলেন, আব্দুল্লাহ আমার ছোট বেলার বন্ধু। তিন দিন আগে ওর সাথে আমার দেখা। তখন ওর মন খারাপ ছিল। দেখলাম ও একটা নম্বরে ফোন করে কান্নাকাটি করছে,মাফ চাচ্ছে। আমি জানতে চাইলে ও (আব্দুল্লাহ) বলে, বন্ধু আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। আমি আমার স্ত্রীকে (সাথী) নিজে উপস্থিত থেকে অন্য স্থানে বিয়ে দিয়েছি। ছেলেটির নাম সুমন। সম্পর্কে আমার চাচাতো ভাই।
মুবাসসের আল মু্বিন বলেন, আমি কারণ জানতে চাইলে বলে, আমাকে বাসা থেকে বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছিল। সাথী আমাকে নানাভাবে ব্লাকমেইল করেছে। আমার দুই ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে এ কাজ করেছি।
“ও দেখলাম বিভিন্ন নম্বরে কল করে মাপ চাচ্ছে। আর বলছিল, আমি বাঁচবো না,” বলেন মুবাসসের।
অভিযোগের বিষয়ে সাথী বলেন, কয়েক দিন আগে আমার স্বামী সুমনকে মোবাইল ফোনে কল করে বলে, তুই আমার একটা কথা রাখ। আমার স্ত্রী-সন্তানের দায়িত্ব নে। সুমন প্রথমে রাজি চিল না। পরে আমার স্বামী চাপ দিয়ে ওকে রাজি করিয়েছে।
সাথী বলেন, পরে আব্দুল্লাহ আমাকে শরীর ছুঁয়ে শপথ করায়। বাধ্য করে সুমনকে বিয়ে করতে রাজি করায়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর এসব কথা হয়। আমি রাজি ছিলাম না। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর নওয়াপাড়ার ধোপাদি এলাকার একটি কাজী অফিসে নিয়ে সুমনের সাথে বিয়ে দেয়। আমার স্বামী ওই কাগজে স্বাক্ষী হিসেবে সাক্ষর করে।
গতকাল রোববার দিবাগত রাতে এসব নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। আমি আমার আব্বাকে সব খুলে বলতে চাই। এক পর্যায়ে ও গলায় গামছা জড়িয়ে ঘরের আড়ার সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করে, বলছিলেন সাথী।
এদিকে, বিদেশে থাকায় অভিযোগের বিষয়ে সুমনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সুমনের ভগ্নিপতি রাকিব হোসেন দাবি করেন, আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পর আমরা বিষয়টি জেনেছি। পরে আমরা সুমনের সাথে যোগাযোগ করেছি। সুমন বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। আব্দুল্লাহ ও সুমনের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের।
মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাঈদ বলেন, আত্মহত্যার খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়েছে। মরদেহের শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
ওই যুবকের স্ত্রীর আর একটি বিয়ে করার বিষয়ে জানতে পেরেছি। নিহতের পরিবার এ বিষয়ে কোন এজাহার না দেওয়ায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মৃত দেহের ময়নাতদন্ত শেষে দাফন সম্পন্ন করে মামলা দায়েরের উদ্দেশ্য মণিরামপুর থানা পুলিশের স্বরনাপন্ন হতে যাচ্ছিলো মৃতের স্বজনেরা।