শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কেশবপুরে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত ফরিদপুরের ভাঙ্গায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে ভাঙ্গায় আলোচনা সভা, ঐক্য ও গণতন্ত্র রক্ষার আহ্বান মণিরামপুরে অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও লিফলেট বিতরণ যশোরস্থ সাতক্ষীরা কল্যাণ সমিতির নির্বাহী সদস্য মোজাফফার হোসেনকে বিদায় সংবর্ধনা যবিপ্রবিতে নানা আয়োজনে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উদযাপিত শ্যামনগরে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত যশোর হামিদপুর আল-হেরা কলেজে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত ছয় বছরের পথচলায় মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত রাতদিন নিউজ, বর্ণাঢ্য আয়োজনে অর্ধযুগ পূর্তি উৎসব জনগণকে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে, অতিরিক্ত টাকা নেওয়া যাবে না: প্রতিমন্ত্রী অমিত

মানবতার ফেরিওয়ালা থেকে হত্যার আসামি শার্শার আলচিত উদ্ভাবক মিজান

  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ জুলাই, ২০২৫
  • ৮৪৮ বার পড়া হয়েছে

মিজানুর রহমান তিনি ছিলেন এক সময়ের মোটর মেকানিক, পরে যিনি হয়ে ওঠেন এক ব্যতিক্রমী উদ্ভাবক। মানুষ তাঁকে চিনত ‘মিজান ইঞ্জিন’-এর আবিষ্কারক হিসেবে, আবার কেউ কেউ ডাকত ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ নামে। কারণ, নিজের উদ্ভাবন আর বিনামূল্যে খাবার বিতরণের উদ্যোগে তিনি ছুঁয়ে গিয়েছিলেন শত শত মানুষের হৃদয়। কিন্তু সেই আলো ছড়ানো মানুষটিই এখন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি—একটি ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ডে, যেখানে নিহত ব্যক্তি ছিলেন তাঁর নিজেরই ভগ্নিপতি। যশোরের বেনাপোলে ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালক সুজায়েতুজ্জামান প্রিন্স হত্যা মামলায় যশোর জেলার আলোচিত উদ্ভাবক মিজানুর রহমান মিজানসহ চারজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ২৪ জুলাই ২০২৫ তারিখ বিকালে যশোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক জয়ন্তী রানী দাস এই রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি আব্দুর রাজ্জাক।

মিজানুর রহমান মিজান—শার্শার আমতলা গাতীপাড়া গ্রামের ছেলে। স্থানীয় গ্যারেজে কাজ করতেন ছোটবেলা থেকেই। নিজের চেষ্টায় তৈরি করেন একাধিক পরিবেশবান্ধব, জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্র। তাঁর তৈরি ‘মিজান ইঞ্জিন’ নিয়ে এক সময় স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়। তিনি গরিব ও ভবঘুরেদের জন্য চালু করেছিলেন ‘ফ্রি খাবার বাড়ি’, যা ছিল শার্শার শ্যামলাগাছী এলাকায়। সেখান থেকে প্রতি সপ্তাহে অসহায় মানুষদের বিনা মূল্যে খাবার সরবরাহ করা হতো।

২০০৪ সালের ২০ আগস্ট। বেনাপোলের নারায়ণপুর গ্রামের যুবক প্রিন্স মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন, কিন্তু আর ফেরেননি। পরদিন তাঁর মরদেহ পাওয়া যায় ছোট নিজামপুরের একটি ধানখেতে। শরীরে ছিল আঘাতের চিহ্ন। মামলার তদন্তে উঠে আসে, প্রিন্সকে হত্যা করে মোটরসাইকেল ছিনতাই করা হয়—এই পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিলেন তাঁরই ঘনিষ্ঠজন, ভগ্নিপতি মিজান।

নিহতের মামা বকতিয়ার শুরুতে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করলেও পরে সন্দেহের তীর যায় মিজানের দিকে। তদন্তে ধরা পড়ে হত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মোটরসাইকেলটি দখল করা। চার্জশিটে নাম আসে মিজানসহ আরও তিনজনের—ইকবাল, সেকেন্দার ও জসিম। দীর্ঘ ২১ বছর পর সেই মামলার রায় ঘোষণা করেন যশোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ জয়ন্তী রানী দাস। রায়ে মিজানসহ চারজনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

যশোর-শার্শা এলাকায় অনেকেই এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না, তাঁদের পরিচিত সেই ‘মিজান ভাই’ আজ দণ্ডিত খুনি। তাঁর হাতে তৈরি স্বয়ংক্রিয় সেচযন্ত্র অনেক কৃষকের চাষাবাদ সহজ করেছিল। তিনি কোনো পুরস্কারের আশায় কাজ করতেন না—মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তাঁর তৃপ্তি। তিনি বলতেন, “যন্ত্র মানুষের কষ্ট কমায়, আর আমি চাই মানুষ হাসুক।” একসময় সেই মানুষই যে এক নির্মম হত্যার দায়ে দোষী হবেন তা কেউ কখনও কল্পনাও করেননি।

স্থানীয়ভাবে এই রায় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ বলছেন, অপরাধ করলে সে যত বড় মানবতাবাদী হোক, শাস্তি তার পেতেই হবে। আবার কেউ মিজানের অতীত কর্মকাণ্ডের কথা স্মরণ করে মর্মাহত।

শার্শার এক প্রবীণ শিক্ষক বললেন, মিজান আমাদের গর্ব ছিল, কিন্তু তার বর্তমান যতই ভালো হোক, যদি সে অপরাধ করে থাকে, তাহলে আইন তার পথেই চলবে। এটা আমাদের শেখায়—মানবতা কখনোই অপরাধের আড়াল হতে পারে না। একটা সময় যিনি ছিলেন আলো ছড়ানো উদ্ভাবক, অসহায়দের জন্য আশ্রয়, সেই মানুষটি আজ যাবজ্জীবনের অন্ধকার পথে। জীবন অনেক সময় এমনই—যেখানে একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্ত মুছে দেয় সব অর্জন, ডুবিয়ে দেয় একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় নামকে ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়ে।

মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু সমাজ ও ইতিহাস ভালো, খারাপ সবকিছু মনে রাখে। মিজানের গল্প সেই সত্যিকারের জীবনের চিত্র, যেখানে মহানতা আর অপরাধ একসঙ্গে অবস্থান করতে পারে না।

 

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews