প্রায় ৬ ঘণ্টা সীমান্ত চেকপোস্টে বিধিনিষেধ, ব্যাহত বন্দর-কাস্টমস, ব্যাংক ও সিঅ্যান্ডএফের স্বাভাবিক কার্যক্রম
শাহাবুদ্দিন আহামেদ, বেনাপোল: কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনের মরদেহ ভারত থেকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হয়েছে।
রবিবার (১১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভারতের পেট্রাপোল সীমান্ত হয়ে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স বেনাপোল চেকপোস্টে পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় ইমিগ্রেশন ও কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সীমান্তের শূন্যরেখায় বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে মরদেহটি হস্তান্তর করা হয়।
মরদেহ হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে বেনাপোল চেকপোস্ট এলাকায় নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা। শনিবার গভীর রাত থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত সীমান্ত সড়ক ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ সময় সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়। এমনকি কাস্টমস, স্থলবন্দর, ব্যাংক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাংবাদিকদের প্রবেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার দিবাগত রাত দেড়টার পর থেকেই বেনাপোল চেকপোস্ট সড়কে দফায় দফায় নিরাপত্তা মহড়া ও নজরদারি বাড়ানো হয়। সীমান্ত এলাকায় প্রবেশের বিভিন্ন পথে বিজিবি সদস্যদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। রবিবার সকাল ৯টার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়। মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স সীমান্ত এলাকা ত্যাগ না করা পর্যন্ত এ বিধিনিষেধ বহাল ছিল।
ছয় ঘণ্টা ব্যাহত স্বাভাবিক কার্যক্রম
চেকপোস্ট এলাকায় দীর্ঘ সময় বিধিনিষেধ থাকায় বেনাপোল স্থলবন্দর, কাস্টমস, সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসা ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচল এবং রোগী পরিবহনসহ বিভিন্ন জরুরি কাজে ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে সীমান্ত এলাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এ সময় পাসপোর্টধারী যাত্রী ছাড়া অন্যদের চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল।
রোটনের মরদেহ কলকাতা থেকে পেট্রাপোল সীমান্তের উদ্দেশে আনার পর দ্রুত হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ভারতীয় ও বাংলাদেশি অংশে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়। রবিবার সকালে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি ভারতের হরিদাসপুর-পেট্রাপোল চেকপোস্ট অতিক্রম করে বেনাপোল সীমান্তে পৌঁছায়। পরে ইমিগ্রেশন ও কাগজপত্র যাচাই শেষে মরদেহ হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্সটি মরদেহ নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেয়।
দীর্ঘদিন ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন রোটন
মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন দীর্ঘদিন ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন। চিকিৎসার জন্য দুই বছরের বেশি সময় ধরে ভারতে অবস্থান করছিলেন তিনি। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মীদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়। পরে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে ঢাকায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গেও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা হয়।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন রোটন চট্টগ্রামের রাউজানের সন্তান মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। ছাত্রলীগের রাজনীতির মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি লাভ করেন। ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন মাহমুদ হাসান রিপন।
ছাত্রলীগের রাজনীতিতে দায়িত্ব পালনের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও সক্রিয় হন রোটন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ২০২১ সালে আওয়ামী লীগের শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য হিসেবেও মনোনীত হন।
নিরাপত্তাবেষ্টনী ঘিরে জনভোগান্তি
রোটনের মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বেনাপোল সীমান্তে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়ের বিধিনিষেধে স্থানীয় ব্যবসায়ী, বন্দর ব্যবহারকারী, যাত্রী, সিঅ্যান্ডএফ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে বন্দর ও কাস্টমসকেন্দ্রিক কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ে।
মরদেহ হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর ধীরে ধীরে সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।