মোঃ হামিদুজ্জামান জলিল। স্টাফ রিপোর্টার: ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ১৩ নম্বর ফুরসন্দি ইউনিয়নের বামনাইল গ্রামে চিকিৎসার নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু এবং পরবর্তীতে নিহতের পরিবারের জন্য আসা ক্ষতিপূরণের পুরো অর্থ আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। শুধু আত্মসাৎই নয়, পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে নানাভাবে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে গ্রামটির কথিত এক ভুয়া ডাক্তারের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, গত ০৪/০৬/২০২৫ তারিখে জরায়ু টিউমার অপারেশনের উদ্দেশ্যে বামনাইল গ্রামের গৃহবধূ আলোমতি বিশ্বাসকে ঝিনাইদহের আল-হেরা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রামের কথিত ডাক্তার দ্বীপ বালা নামের এক ব্যক্তির পরামর্শ ও মধ্যস্থতায় রোগীকে ঐ হাসপাতালে ভর্তি করেন স্বজনেরা। পরবর্তীতে চিকিৎসক ডা. শান্তনু ঘোষ রোগীর অপারেশন সম্পন্ন করেন। তবে অপারেশনের ধকল সামলাতে না পেরে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আলোমতি বিশ্বাসের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটে।
ঘটনার পর চিকিৎসাজনিত ত্রুটি ও রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে আলোচনা হয়। মানবিক বিবেচনা ও স্বজনদের ক্ষতির কথা চিন্তা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃতের পরিবারের ক্ষতিপূরণ হিসেবে মোট ১,৬০,০০০/- (এক লক্ষ ষাট হাজার) টাকা হস্তান্তর করে। টাকাটি পৌঁছানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় মধ্যস্থতাকারী সেই কথিত ডাক্তার দ্বীপ বালাকে। তবে অভিযোগ রয়েছে, হস্তান্তরিত সেই ক্ষতিপূরণের সম্পূর্ণ অর্থ দ্বীপ বালা নিহতের অসহায় স্বজনদের না দিয়ে নিজে আত্মসাৎ করেন।
ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ ১ বছর ৪ মাস পার হয়ে গেলেও নিহতের স্বজনেরা ক্ষতিপূরণের এক টাকাও পাননি। অর্থাভাব ও স্বজন হারানোর শোকে দিশেহারা পরিবারটি যখন দ্বীপ বালার কাছে তাদের পাওনা টাকা চাইতে যায়, তখনই ঘটে বিপত্তি। টাকা দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো এলাকার বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নেতাদের নাম ভাঙিয়ে নিহতের পরিবারকে চূড়ান্তভাবে হুমকি-ধামকি দেওয়া শুরু হয়। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন নিহতের স্বজনেরা।
অনুসন্ধানে অভিযুক্ত দ্বীপ বালার আসল পরিচয় উন্মোচন করতে সরেজমিনে বামনাইল গ্রামে যায় প্রতিনিধি দল। দ্বীপ বালা উক্ত গ্রামের মৃত প্রদ্যুত বালার পুত্র। গ্রামের প্রধান মোড়ে তার একটি নিজস্ব ফার্মেসি রয়েছে, যেখানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত রোগী দেখে আসছেন এবং নানা জটিল রোগের চিকিৎসাও দিচ্ছেন। সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় তার ডাক্তারি পাসের সনদ কিংবা চিকিৎসার কোনো অনুমোদিত লাইসেন্স দেখতে চাওয়া হলে তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন। বারবার দেখতে চাওয়ার একপর্যায়ে তিনি ক্ষিপ্ত হন এবং পরবর্তীতে নিজের মুখে স্বীকার করেন যে তার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো মেডিকেল ডিগ্রি বা পেশাগত সনদ নেই। তিনি জানান, তার দাদা একসময় চিকিৎসা করতেন এবং দাদার কাছ থেকে দেখে ও শিখে তিনি নিজে এই পেশায় নেমেছেন। শুধু তাই নয়, গ্রামে তিনি যে ওষুধ বিক্রি করছেন, সেই ফার্মেসিরও কোনো বৈধ ড্রাগ লাইসেন্স নেই বলে নিজের মুখে স্বীকারোক্তি প্রদান করেন এই ভুয়া ডাক্তার।
অসহায় ভুক্তভোগী পরিবারটি এখন স্বজন হারানোর বিচারের পাশাপাশি তাদের আত্মসাৎ হওয়া টাকা ফেরত পেতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। তারা অভিযুক্ত প্রতারক দ্বীপ বালার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। এদিকে একই গ্রামের সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল বিষয়টি নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। লাইসেন্সবিহীন ও ডিগ্রিহীন এমন ভূয়া ডাক্তারদের কারণে প্রতিনিয়ত সাধারণ ও অজ্ঞ মানুষ চিকিৎসার নামে প্রতারিত হচ্ছে এবং জীবন হারাচ্ছে উল্লেখ করে তারা অবিলম্বে আল-হেরা হাসপাতাল, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এবং কথিত ডাক্তার দ্বীপ বালার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।