মফিজুর রহমান, বাঁকড়া (ঝিকরগাছা): দুর্ঘটনায় বাম পা হারানোর পরও থেমে থাকেননি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার হাজিরবাগ ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামের ইউসুফ আলী। ষাটোর্ধ্ব এই ভ্যানচালক বিশেষভাবে তৈরি একটি চার্জার ভ্যান চালিয়ে গত এক বছর ধরে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি তাঁর দুর্দশার কথা জানতে পেরে যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদের উদ্যোগে তাঁর কৃত্রিম পা সংযোজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ইউসুফ আলী বিষ্ণুপুর গ্রামের নৌমুদ্দিন মোড়লের ছেলে। দুই মেয়ের দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর সংসার। বসতভিটা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো জমিজমা নেই। সংসারের খরচ চালাতে বয়সের ভার উপেক্ষা করেই ভ্যান চালিয়ে আসছিলেন তিনি।
২০২৫ সালে হাজিরবাগ ইউনিয়নের মাটিকোমরা গ্রামের একটি কালভার্টের কাছে ভ্যান চালানোর সময় দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন ইউসুফ আলী। পরে স্বজন ও প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় তাঁকে যশোর পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁর বাম পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয়। চিকিৎসা বাবদ খরচ হয় দুই লাখ টাকার বেশি।
পা হারানোর পর আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায় ইউসুফ আলীর। তবু সংসার চালাতে আবার ভ্যান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাঁর এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন যশোর পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক ও মনিরামপুর উপজেলার হরিহরনগর ইউনিয়নের বাঁকড়া বাজারসংলগ্ন পাঁচপোতা গ্রামের ডা. আব্দুর রউফ। চিকিৎসা শেষে মানবিক সহায়তা হিসেবে তিনি ইউসুফ আলীর জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি চার্জার ভ্যানের ব্যবস্থা করে দেন।
সেই ভ্যান চালিয়েই গত এক বছর ধরে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন ইউসুফ আলী। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল তাঁর দিন। এর মধ্যে তাঁর কৃত্রিম পা সংযোজনের বিষয়টি নিয়ে কেউ উদ্যোগ নেননি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
পরে ইউসুফ আলীর কষ্টের কথা জানতে পারেন সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ। তাঁর উদ্যোগে ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে ইউসুফ আলীকে ঢাকার মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার গোলড়া এলাকায় আকিজ টেক্সটাইল মিলসের ভেতরে অবস্থিত ‘নতুন কদম হাত ও পা সংযোজন কেন্দ্র’-এ নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর কৃত্রিম পা সংযোজন করা হয়।
কৃত্রিম পা সংযোজনের পর গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ইউসুফ আলীর বাড়িতে যান ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ। সেখানে তিনি ইউসুফ আলীর শারীরিক অবস্থা ও কৃত্রিম পা ব্যবহারের বিষয়ে খোঁজ নেন।
এ সময় ইউসুফ আলী আবেগাপ্লুত হয়ে সংসদ সদস্যকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম পা পাওয়ার পর আবার হাঁটতে ও চলতে পারছেন। তাঁর মতো একজন মানুষের জন্য এটি অনেক বড় পাওয়া।
তবে কৃত্রিম পা ব্যবহারে এখনো পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না ইউসুফ আলী। তিনি জানান, পা পরলে অস্বস্তি হয় এবং শরীরের ওই অংশে ব্যথাও অনুভূত হয়।
বিষয়টি শুনে ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কৃত্রিম পা পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করার জন্য তিনি নির্দেশ দেন। ভবিষ্যতে ইউসুফ আলী যাতে কোনো ধরনের সমস্যায় না পড়েন, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন তিনি।
এ ছাড়া পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য ইউসুফ আলীর যাতায়াতসহ অন্যান্য খরচ বহনের ব্যবস্থা করতে নিজের ব্যক্তিগত সহকারীকে নির্দেশ দেন সংসদ সদস্য।
ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ বলেন, আকিজ ইনসাফ গ্রুপের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকার অঙ্গহারা মানুষের বিনা মূল্যে কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজনের কাজ করা হচ্ছে। অভিজ্ঞ দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে অঙ্গ হারানো মানুষের জন্য বিষয়টি শুধু শারীরিক কষ্টের নয়; এর সঙ্গে জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার বিষয়টিও জড়িত। তাই কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজনের পর সেটি ব্যবহারে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ইউসুফ আলীর বাড়িতে যাওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন হাজিরবাগ ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সভাপতি মাওলানা আসাদুল ইসলাম, ইসলামী ছাত্রশিবিরের যশোর জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক অফিস সম্পাদক মো. ফজর আলীসহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
‘নতুন কদম’ হাত ও পা সংযোজন কেন্দ্রটি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার গোলড়া এলাকায় আকিজ টেক্সটাইল মিলস প্রাঙ্গণে অবস্থিত। কেন্দ্রটি ২০২০ সালে চালু করা হয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় অঙ্গহারা অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জন্য বিনা মূল্যে কৃত্রিম হাত-পা সংযোজনের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।