ইমরান হোসেন, কেশবপুর (যশোর), প্রতিনিধি: যশোরের কেশবপুরের বাসবাড়িয়া খাল খননে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে খনন করা একই খাল চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবারও খননের নামে প্রায় ৫১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
খালপাড়ে ৩০০টি বনজ ও ফলজ গাছ লাগানোর কথা থাকলেও বাস্তবে গাছ পাওয়া গেছে মাত্র ৯৫টি। অভিযোগ রয়েছে, ৫ থেকে ৩০ টাকা মূল্যের ছোট গাছ লাগিয়ে প্রতিটি গাছের বিপরীতে ৫০১ টাকা করে ভাউচার করা হয়েছে।
অভিযোগের পর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সোমবার বাসবাড়িয়া খাল পরিদর্শন করেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের। পরিদর্শন শেষে তিনি খাল খনন ও গাছ রোপণে কিছুটা অনিয়ম হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত চিত্র ও দুর্নীতির পরিমাণ জানা যাবে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বলেন, সরকারি কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সাধারণত তিন বছরের মধ্যে একই স্থানে পুনরায় প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বাসবাড়িয়া খালের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরে ধর্মপুর ব্রিজ থেকে বাসবাড়িয়া পর্যন্ত খালটি খননের জন্য ৫১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২৩ মে কাজ শুরু হয়ে ৩০ জুনের মধ্যে তা শেষ দেখানো হয়। প্রকল্পের চেয়ারম্যান করা হয় সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের ইউপি সদস্য কামরুল ইসলামকে।
প্রকল্প চেয়ারম্যানের দাবি, উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের কর্মকর্তাদের নির্দেশে সাব-ঠিকাদার মোকলেছুর রহমান মুকুলকে দিয়ে ভেকু মেশিনে খাল খনন করানো হয়।
সাব-ঠিকাদার মোকলেছুর রহমান মুকুলের দাবি, দুটি এস্কেভেটর দিয়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ দিন কাজ করা হলেও বিপুল পরিমাণ সময়ের কাজ দেখিয়ে প্রায় ২১ লাখ ৪৬ হাজার টাকার বিল করা হয়েছে। অথচ তাকে দেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা। বাকি টাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রকল্প চেয়ারম্যান ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে প্রকল্প চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি প্রকল্প চেয়ারম্যান হলেও প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশে হয়েছে।
এদিকে, খালপাড়ে ৩০০টি গাছ লাগানোর জন্য ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৪২৩ টাকা বরাদ্দ থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, সেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গাছ দেখা যায়নি। কয়েকজন শ্রমিকও দাবি করেছেন, নির্ধারিত সংখ্যক শ্রমিক ও সময় অনুযায়ী কাজ করানো হয়নি এবং মজুরি নিয়েও অনিয়ম হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কামরুজ্জামান ও আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই বাসবাড়িয়া খালটি খনন করা হয়েছিল। খালের গভীরতাও ছিল যথেষ্ট। এরপরও একই খালে নতুন করে খনন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, খালের একটি অংশে কোনো খননকাজ হয়নি এবং মেহেরপুর এলাকাতেও গাছ রোপণ করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের একটি অংশ বাস্তবায়ন না করে ৬ লাখ ২৪ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এরপরও প্রকল্পের মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ টাকা এবং খননকাজের বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী মোস্তাফিজুর রহমান মুক্ত জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে বিএডিসির অর্থায়নে বাসবাড়িয়া খালটি খনন করা হয়েছিল।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইসতিয়াক হোসেন বলেন, খাল খননের কাজ প্রকল্প অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ সঠিক নয়। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ওই খাল খনন করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।
অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প অফিসের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রকল্প অনুযায়ী খাল খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে দুর্নীতির প্রশ্ন ওঠে না।
তবে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার পরিদর্শনে গাছ রোপণ ও খাল খননে অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসায় এখন পুরো প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—মাত্র দুই বছর আগে খনন করা একটি খালে আবারও কেন একই ধরনের প্রকল্প নেওয়া হলো? প্রকল্পের বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যদি খাল খনন ও গাছ রোপণে অনিয়ম থেকে থাকে, তাহলে এর দায় কার?
স্থানীয়দের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয়, খননকাজের পরিমাণ, গাছ রোপণের সংখ্যা এবং অর্থ ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হোক।