যশোর অফিস : পড়াশোনা, খেলাধুলা আর অভিনয় সবখানেই যার সমান পারদর্শিতা, সেই বিস্ময় বালিকা সুরাইয়া আক্তার জুঁই এবার তার স্বপ্নের আরও একধাপ কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। যশোরের ঝিকরগাছার গর্ব এই মেয়েটি সম্প্রতি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে (বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) অ্যাথলেটিক্সে ভর্তির গৌরব অর্জন করেছে।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়নের বেনেয়ালী কলোনিপাড়ার মেয়ে জুঁই। বাবা রাজু আহমেদ পেশায় একজন ট্রাকচালক এবং মা বেবী খাতুন গৃহিণী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে জুঁই দ্বিতীয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের নানা সীমাবদ্ধতাও জুঁইয়ের প্রতিভাকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি। ঝিকরগাছার এফজেডইউবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী পড়াশোনাতেও বেশ মেধাবী, শ্রেণিতে তার রোল দ্বিতীয়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জুঁই অলরাউন্ডার।
জুঁইয়ের প্রতিভার বিকাশ শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই। বেনেয়ালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় মুঠোফোনে অভিনয় দেখে তা রপ্ত করে এবং স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে একক অভিনয়ে সবার নজর কাড়ে। এরপর শিক্ষক আশরাফুল ইসলামের অনুপ্রেরণা এবং নিজের অদম্য ইচ্ছায় সে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করে। অভিনয় ও খেলাধুলার পাশাপাশি বিতর্ক ও উপস্থিত বক্তৃতায়ও সে দুর্দান্ত।
ক্রীড়াক্ষেত্রে জুঁইয়ের বহুমুখী সাফল্য চোখে পড়ার মতো। সে যেমন ফুটবল মাঠে সেরা, তেমনই ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডেও অনন্য। ২০২২-২৩ সালে বেনেয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে ‘বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা’য় উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে তার দল। সেই আসরে জুঁই একাই সেরা গোলদাতা, সেরা খেলোয়াড় এবং ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হয়।
অ্যাথলেটিক্সে জুঁইয়ের জয়রথ আরও অসাধারণ। ২০২২ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ে দৌড়ে প্রথম এবং উপজেলায় উপস্থিত বক্তৃতা, দীর্ঘ লাফ ও উচ্চ লাফে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে সাতটি সনদ নিজের ঝুলিতে পুরে নেয় সে। তার পরের বছরও জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা ও জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতায় একক অভিনয়ে উপজেলা পর্যায়ে প্রথম এবং দৌড় ও দীর্ঘ লাফে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করে। এ পর্যন্ত তার ঝুলিতে জমা হয়েছে অন্তত ২২টি জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সাফল্যের সনদ।
ঝিকরগাছা স্পোর্টস ক্লাবে নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি সে সবসময় স্বপ্ন দেখত বিকেএসপিতে সুযোগ পাওয়ার, যেখানে নিজেকে একজন পেশাদার অ্যাথলেট হিসেবে গড়ে তোলা যায়। অবশেষে কঠোর পরিশ্রম, মেধা আর একাগ্রতার জোরে জুঁইয়ের সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। সে এখন বিকেএসপির ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে একজন নিয়মিত প্রশিক্ষণার্থী।
মেয়ের এই সাফল্যে আনন্দিত ও গর্বিত জুঁইয়ের পরিবার ও শিক্ষকরা। জুঁইয়ের স্কুলের শরীরচর্চা শিক্ষক ফরিদা পারভীন বলেন, সুরাইয়া আক্তার জুঁই অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। সে শুধু ঝিকরগাছা নয়, পুরো দেশের গর্ব। আমরা বিশ্বাস করি বিকেএসপির সুশৃঙ্খল পরিবেশ ও উন্নত প্রশিক্ষণ তাকে দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে তুলবে।
ভবিষ্যতে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে দেশের হয়ে ঝড় তুলতে চায় জুঁই, লাল-সবুজের পতাকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে চায়। একই সাথে অভিনয়ের প্রতি নিজের ভালোবাসাটাও টিকিয়ে রাখতে চায় সে। ঝিকরগাছার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সব বাধা পেরিয়ে জুঁই একদিন সফল অ্যাথলেট ও গুণী শিল্পী হয়ে দেশবাসীর মন জয় করবে।