ঝিকরগাছা (যশোর) প্রতিনিধি : যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ৫নং পানিসারা ইউনিয়ন পরিষদে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি (টি আর) প্রকল্পের অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধন কাজে ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মোঃ ফরহাদ হোসেন ও প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য রেজাউল করিম খোকা একে অপরের ওপর দায় চাপিয়েছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় শনিবার (২৩ মে) সকালে সরকারের নির্ধারিত অফিস সময় শুরু হলেও ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত ছিলেন না প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মোঃ ফরহাদ হোসেন। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাকে অফিসে আসতে দেখা যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টি আর (টেস্ট রিলিফ) কর্মসূচির অর্থ মূলত গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়ের কথা থাকলেও পানিসারা ইউনিয়ন পরিষদে ওই অর্থ দিয়ে পরিষদের মূল ফটকের প্রায় ১৭ ফুট উচ্চতার দুটি পিলার, স্টিলের গেট নির্মাণ, রাস্তা ঢালাই, কলাপসিবল গেট স্থাপন এবং দুটি কক্ষে ছাদের সিলিংয়ের কাজ করা হয়েছে। এসব কাজে প্রায় ৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হলেও এখনো কাজ সম্পূর্ণ হয়নি এবং নিম্ন মানের কাজে অতিরিক্ত বিল ধরা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে প্রকল্প সংক্রান্ত কোনো সাইনবোর্ড বা ব্যয়ের তালিকা দেখা যায়নি। অথচ 'গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন নির্দেশিকা-২০২১ এর ৮ নম্বর কলামের (জ) উপ ধারা ৭ ও ৮ অনুযায়ী প্রকল্প শুরুর আগেই সাইনবোর্ড স্থাপন এবং ইউনিয়নের সকল প্রকল্পের তালিকা জনসম্মুখে প্রদর্শনের নির্দেশনা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের সভাপতি ছিলেন ইউপি সদস্য রেজাউল করিম খোকা কিন্তু কাজ করেছেন সচিব নিজেই।
এ বিষয়ে সচিব মোঃ ফরহাদ হোসেন প্রথমে বলেন, প্রকল্পের খরচ সম্পর্কে আমার জানা নেই। এ বিষয়ে প্রকল্প সভাপতি বলতে পারবেন। বিলও তিনি সাবমিট করেছেন। তবে পরে তিনি জানান, মূল ফটকের গেট নির্মাণ ব্যায় তিনি নিজে করেছেন। এছাড়া অন্য কাজের বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি প্রকল্পে মূল গেটের পিলার, স্টিলের ঠেলা গেট, রাস্তা ঢালাই ও কলাপসিবল গেট নির্মাণে ৪ লাখ টাকা প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়। দ্বিতীয় প্রকল্পে গ্রাম আদালতের স্টেজ, বিচারকের চেয়ার ও রেলিং নির্মাণে ১ লাখ ৪১ হাজার টাকা ব্যায় দেখানো হয়েছে। এছাড়া আরও দুটি প্রকল্পে ১ লাখ ৬১ হাজার ও ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখিয়ে দুটি কক্ষের ৮টি ৬ মিলিমিটার গ্লাসের জানালার জন্য প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। বাকি টাকা দুটি কক্ষের সিলিং ও একটি কক্ষের মেঝেতে টাইলস বসানোর কাজে ব্যয় করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে এখনো জানালায় রং ও বিয়ারিং বসানোর কাজ বাকি রয়েছে। আর গ্রাম আদালতের স্টেজ ছাড়া দৃশ্যমান কোনো আসবাবপত্র দেখা যায়নি।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থ ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে সচিব বলেন, আমার সুপারিশে ইউএনওর অনুমতি নিয়েই কাজ করা হয়েছে। সাইনবোর্ড না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এখনও কাজ শেষ হয়নি সে জন্য সাইনবোর্ড বসানো হয়নি।
অন্যদিকে প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য রেজাউল করিম খোকা বলেন, সকল প্রকল্পের ব্যয় ও বিল সচিব সাবমিট করেছেন। আমি শুধু প্রকল্প সভাপতি হিসেবে স্বাক্ষর করেছি। এর জবাবে সচিব ফরহাদ হোসেন বলেন, সভাপতি বিল সাবমিট করে টাকা তুলে আমার কাছে দিয়েছেন। আমি সব লিখে রেখেছি। এখন সময় পার হয়ে যাওয়ায় তিনি অস্বীকার করছেন। আমি মালামাল যাচাই করে সভাপতিকে জানিয়েছি, পরে তিনি বিল পরিশোধ করেছেন।
এ বিষয়ে ঝিকরগাছা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জালাল আহমেদ বলেন, বর্তমান বরাদ্দগুলো আমার দপ্তরের আওতাভুক্ত কি না, তা আগে দেখতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদে বিভিন্ন দপ্তরের বরাদ্দ থাকে। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।
ইউনিয়নের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঝিকরগাছা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আমি যোগদানের পূর্বেই এসকল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কিভাবে কি করা হয়েছে সেটা প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) ভালো বলতে পারবেন।
ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাফফাত আরা সাইদ বলেন, আমি নিজে গিয়ে পরিদর্শন করে কাজের মান নিম্নমানের পেয়েছি। এই সকল প্রকল্প এখানে এভাবে করার কথা নয়। আমি বিল দিতে নিষেধ করে দিয়েছি।
এলাকাবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর থেকেই সচিব ফরহাদ হোসেন তার ইচ্ছে মতো পরিষদ চালাচ্ছেন। তিনি ঠিকমতো অফিস করেননা। তার পছন্দের খোকা ও জবেদা মেম্বারকে একাধিক প্রকল্পের সভাপতি বানিয়ে তাদের স্বাক্ষরে টাকা উত্তোলন করে আইন বহির্ভূত ভাবে নিজেই সকল প্রকল্পের কাজ করেছেন। এসব প্রকল্পে ব্যপক অঙ্কের টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।