আবু রায়হান, মণিরামপুর (যশোর):যশোরের মণিরামপুর উপজেলার বিপ্রকোনা গ্রামে ঢুকলেই কানে আসে হাতুড়ির টুংটাং শব্দ। কোথাও আগুনের তাপে লোহা গলছে, কোথাও আবার দক্ষ হাতে তৈরি হচ্ছে রান্নার কড়াই। গ্রামের নারী-পুরুষ মিলে দিনভর ব্যস্ত থাকেন এই কাজে। ছোট্ট একটি গ্রাম হলেও এখানকার তৈরি কড়াই এখন ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।
দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নের বিপ্রকোনা গ্রামের বহু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে কড়াই তৈরির সঙ্গে জড়িত। স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব কড়াইয়ের চাহিদা রয়েছে যশোর ছাড়াও খুলনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই শিল্প এখন অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, অনেক বাড়ির উঠোনেই গড়ে উঠেছে ছোট ছোট কারখানা। কোথাও পুরুষরা আগুনে লোহা গরম করছেন, আবার কোথাও নারীরা কড়াই ঘষে মসৃণ করছেন। কেউ হাতুড়ি দিয়ে আকার দিচ্ছেন, কেউ শেষ ধাপের পালিশের কাজ করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে এ কাজ মূলত পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীরাও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছেন। এখন অনেক নারী সংসারের কাজ সামলানোর পাশাপাশি কড়াই তৈরির বিভিন্ন ধাপে কাজ করছেন।
এক নারী কারিগর বলেন, “আগে শুধু ঘরের কাজ করতাম। এখন স্বামীর সঙ্গে কড়াই তৈরির কাজেও সাহায্য করি। এতে সংসারে বাড়তি আয় হচ্ছে।”
আরেকজন জানান, প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা কাজ করেই তারা পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারছেন।
স্থানীয় কারিগররা জানান, তাদের পূর্বপুরুষরা একসময় মৃৎশিল্পের কাজ করতেন। সময়ের পরিবর্তনে সেই পেশা ধীরে ধীরে কমে গেলে অনেকে ধাতব কড়াই তৈরির কাজে যুক্ত হন। বর্তমানে এটাই গ্রামের বহু পরিবারের প্রধান জীবিকা।
কারিগরদের দাবি, হাতে তৈরি কড়াই টেকসই হওয়ায় বাজারে এর আলাদা চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক মানুষ ঐতিহ্যবাহী ভারী কড়াই ব্যবহার করতে পছন্দ করেন।
একজন প্রবীণ কারিগর বলেন, “এই কাজই আমাদের পরিচয়। ছোটবেলা থেকে বাবাদের সঙ্গে কাজ শিখেছি। এখন নিজের ছেলেরাও এই পেশায় এসেছে।”
তবে তারা জানান, আগের তুলনায় কাঁচামালের দাম অনেক বেড়ে গেছে। লোহা ও অন্যান্য ধাতব সামগ্রীর দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। ফলে লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
কারিগরদের অভিযোগ, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক কাজ এখনো হাতে করতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে এবং উৎপাদনও সীমিত থাকে।
তাদের দাবি, যদি উন্নত মেশিন ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন বড় বাজারেও এসব পণ্য সরবরাহ করা যাবে।
একজন তরুণ কারিগর বলেন, “আমরা যদি সরকারি সহায়তা পাই, তাহলে বড় পরিসরে কাজ করতে পারব। এখন অনেক সময় অর্ডার থাকলেও সময়মতো সরবরাহ দিতে কষ্ট হয়।”
বিপ্রকোনার কড়াই শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ স্থানীয় সমাজেও ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। আগে যেসব নারী শুধু গৃহস্থালির কাজ করতেন, এখন তাদের অনেকেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “এই কাজের কারণে গ্রামের অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে। বিশেষ করে নারীরা আয় করতে পারায় সংসারে স্বস্তি এসেছে।”
অনেক পরিবারে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচও এখন এই শিল্প থেকেই চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর মতে, কড়াই তৈরির কারণে বিপ্রকোনা গ্রাম এখন আশপাশের এলাকায় আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে এখানে কড়াই কিনতে আসেন। কেউ আবার পাইকারি দরে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, উৎসব মৌসুম এবং শীতকালে কড়াইয়ের চাহিদা আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে বড় আকারের রান্নার কড়াইয়ের অর্ডার বেশি থাকে।
কারিগর ও স্থানীয়দের দাবি, এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তারা সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্পকে সহায়তা করা গেলে তা শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই শক্তিশালী করবে না, বেকারত্ব কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের মতে, বিপ্রকোনার মতো গ্রামে ঐতিহ্যভিত্তিক শিল্পের উন্নয়ন হলে দেশীয় পণ্যের বাজারও আরও সমৃদ্ধ হবে।
সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আশাবাদী বিপ্রকোনার কারিগররা। তারা চান, একদিন তাদের তৈরি কড়াই দেশের বড় বাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছাক।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, যথাযথ সহায়তা পেলে বিপ্রকোনার কড়াই শিল্প ভবিষ্যতে আরও বড় পরিচিতি পাবে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি করবে।